আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি ১৯২০ সালের জোন্স অ্যাক্ট আইনটি ৬০ দিনের জন্য সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন। উদ্দেশ্য? দেশের ভেতরে তেল, গ্যাস, সার ও কয়লার পরিবহন সহজ করে গ্যাসের দাম কমানো। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—এই সিদ্ধান্ত কি সত্যিই কাজ করবে? নাকি এটি শুধুই একটি রাজনৈতিক ঘোষণা, যা ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে বাড়তে থাকা জ্বালানি সংকটের মুখে আমেরিকানদের সাময়িক স্বস্তি দিতে পারবে না?
এই খবরটি এসেছে এনপিআর থেকে, যেখানে বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে যে, ইরান যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে গ্যাসের দাম প্রতি গ্যালনে ৯২ সেন্ট বেড়েছে। স্ট্রেইট অব হরমুজ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম আকাশছোঁয়া। ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, এই স্থগিতাদেশের মাধ্যমে বিদেশি জাহাজগুলো আমেরিকার বন্দরগুলোর মধ্যে তেল পরিবহন করতে পারবে, যাতে শিপিং খরচ কমে এবং সরবরাহ দ্রুত হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর প্রভাব হবে নগণ্য—প্রতি গ্যালনে মাত্র কয়েক ফ্র্যাকশন পেনি কমতে পারে। চলুন, এই বিষয়টি গভীরভাবে আলোচনা করি। আমরা দেখব কেন এই আইনটি এত গুরুত্বপূর্ণ, ট্রাম্প কেন এটি স্থগিত করলেন, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা, শিল্প মহলের প্রতিক্রিয়া কী এবং সাধারণ আমেরিকানদের জীবনে এর প্রকৃত প্রভাব কতটা। এই আলোচনা শুধু খবর নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
প্রথমেই বুঝে নেওয়া যাক, জোন্স অ্যাক্ট আসলে কী? ১৯২০ সালের এই আইনটি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এর নিয়ম স্পষ্ট—যেকোনো পণ্য যদি এক আমেরিকান বন্দর থেকে আরেক আমেরিকান বন্দরে যায়, তাহলে সেই জাহাজটি অবশ্যই আমেরিকায় তৈরি, আমেরিকান মালিকানাধীন, আমেরিকান ক্রু দিয়ে পরিচালিত এবং আমেরিকান পতাকা উড়িয়ে চলতে হবে। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় শিপিং শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া, যাতে বিদেশি প্রতিযোগিতায় আমেরিকান কর্মী ও কোম্পানিগুলো না হারিয়ে যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আইনটি অনেকের কাছে একটি ‘অদক্ষতার প্রতীক’ হয়ে উঠেছে। কারণ আমেরিকায় জাহাজ তৈরির খরচ বিদেশের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি, পরিচালন খরচ চার গুণ বেশি। ফলে তেল শোধনাগারগুলো প্রায়ই দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তেল আমদানি করে, কারণ অভ্যন্তরীণ পরিবহনের খরচ অসম্ভব বেশি।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই ৬০ দিনের ওয়েভার (স্থগিতাদেশ) এই নিয়মকে শিথিল করেছে। এখন বিদেশি ফ্ল্যাগের জাহাজগুলো আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রুটে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার ও কয়লা বহন করতে পারবে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত অপারেশন ইপিক ফিউরির সময় তেল বাজারের স্বল্পমেয়াদী বিঘ্ন মোকাবিলায় আরেকটি পদক্ষেপ। এটি তেল, গ্যাস, সার ও কয়লার মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদকে ৬০ দিনের জন্য মুক্তভাবে আমেরিকান বন্দরগুলোতে প্রবাহিত করবে। আমরা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই চেইনকে আরও শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” এই ঘোষণার পেছনে মূল কারণ ইরান যুদ্ধ। যুদ্ধের কারণে স্ট্রেইট অব হরমুজে তেলের ট্রাফিক প্রায় শূন্য। ইরান এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং আমেরিকায় গ্যাসের দাম এক মাসে ৯২ সেন্ট প্রতি গ্যালন বেড়েছে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে ‘গ্যাসের দাম কমাবেন’ বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন যুদ্ধ তাঁর সেই প্রতিশ্রুতিকে চ্যালেঞ্জ করছে। তাই এই ওয়েভারকে তিনি একটি তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে দেখছেন।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন? ইউএস ফেডারেল মেরিটাইম কমিশনের সাবেক কমিশনার উইলিয়াম ডয়েল, যিনি ট্রাম্প ও ওবামা উভয় প্রশাসনেই কাজ করেছেন এবং বর্তমানে ড্রেজিং কন্ট্রাক্টরস অব আমেরিকার সিইও, স্পষ্ট করে বলেছেন, “প্রভাব হবে ন্যূনতম। যদি কোনো সঞ্চয় হয়, তাহলে প্রতি গ্যালনে মাত্র কয়েক ফ্র্যাকশন পেনি।” তিনি আরও বলেন, “গ্যাসের দামের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ নির্ভর করে বিশ্ববাজারের প্রতি ব্যারেল তেলের দামের ওপর। এর সঙ্গে জোন্স অ্যাক্টের কোনো সম্পর্ক নেই।” অর্থাৎ, শিপিং খরচ কমলেও তেলের মূল্য নির্ধারিত হয় বিশ্ববাজারে। ইরান যতদিন স্ট্রেইট অব হরমুজ চেপে ধরে থাকবে, ততদিন তেলের দাম কমবে না। এই ওয়েভার শুধু অতিরিক্ত জাহাজ ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান করছে না।
আমেরিকান মেরিটাইম পার্টনারশিপ, যা মেরিটাইম শিল্পের লবিং গ্রুপ, এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা বলছে, “আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এই ৬০ দিনের ব্রড ওয়েভার অপব্যবহার হয়ে আমেরিকান কর্মী ও কোম্পানিগুলোকে বাস্তচ্যুত করবে। আইনের উচ্চ মানদণ্ড আছে—ওয়েভার শুধু সামরিক অপারেশনের তাৎক্ষণিক হুমকির জন্য, বিদেশি অপারেটরদের পুরস্কৃত করার জন্য নয়।” তারা আরও জোর দিয়ে বলেছে, “এই ওয়েভার গ্যাসের দাম কমাবে না। অভ্যন্তরীণ শিপিংয়ের সর্বোচ্চ প্রভাব জাতীয়ভাবে প্রতি গ্যালন গ্যাসে এক পেনিরও কম।” এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, দেশীয় শিল্প রক্ষার জন্য এই আইনটি তৈরি হয়েছিল, কিন্তু স্থগিতাদেশ দিয়ে বিদেশি জাহাজ ঢোকালে আমেরিকান শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে, জোন্স অ্যাক্টের বিরোধীরা বলছেন, এই আইনটি পুরোপুরি বাতিল করাই একমাত্র দীর্ঘমেয়াদী সমাধান। ক্যাটো ইনস্টিটিউটের হার্বার্ট এ. স্টিফেল সেন্টার ফর ট্রেড পলিসি স্টাডিজের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর কলিন গ্রাবো, যিনি নিজেকে ‘ফ্রি ট্রেডের পেশাদার সমর্থক’ বলে পরিচয় দেন, বলেছেন, “এটি বাজারের একটি অদক্ষতা। অদক্ষতা থাকলে খরচ বাড়ে।” তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, আমেরিকার শ্রম ও উপকরণের খরচ এত বেশি যে, রিফাইনারিগুলো দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তেল আমদানি করতে পছন্দ করে। “পরিবহন খরচ যোগ করলে অভ্যন্তরীণ চলাচল অর্থহীন হয়ে যায়।” আমেরিকায় তৈরি জাহাজের খরচ বিদেশি জাহাজের পাঁচ গুণ, পরিচালন খরচ চার গুণ। ফলে এনার্জি পণ্যের পরিবহনে এই খরচ বিশেষভাবে প্রকট। গ্রাবোর মতে, “আমাদের শিল্প নেই। এটি একটি সম্পূর্ণ ব্যর্থতা। আমাদের এটি থেকে সরে আসা উচিত।”
এখন প্রশ্ন হলো, সাধারণ আমেরিকান নাগরিকের জীবনে এর প্রভাব কী? কল্পনা করুন, একজন সাধারণ পরিবারের কর্তা প্রতিদিন গাড়ি চালিয়ে অফিস যান। গ্যাসের দাম ৯২ সেন্ট বাড়লে মাসিক খরচ কতটা বেড়ে যায়? সপ্তাহে দু-তিনবার গ্যাস স্টেশনে গিয়ে পকেট খালি হয়ে যায়। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত তাঁদের জন্য একটি আশার আলো হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু যদি বিশেষজ্ঞদের কথা সত্যি হয়, তাহলে এই আশা কতটা টিকবে? শুধু শিপিং খরচ কমলে তেলের মূল্য কমবে না, কারণ ৪০-৫০ শতাংশ খরচ বিশ্ববাজার-নির্ভর। ইরান যুদ্ধ যতদিন চলবে, ততদিন সংকট থাকবে। এছাড়া, ওয়েভার মাত্র ৬০ দিনের। এরপর আবার পুরনো নিয়ম ফিরে আসবে। তাহলে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান কোথায়?
আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য একটি চাল। তিনি নির্বাচনী প্রচারে বলেছিলেন গ্যাসের দাম কমাবেন। যুদ্ধ এসে সেই প্রতিশ্রুতিকে বিপন্ন করেছে। তাই জোন্স অ্যাক্ট স্থগিত করে তিনি দেখাতে চাইছেন যে, তিনি কিছু করছেন। কিন্তু এটি কি সত্যিই কার্যকর? মেরিটাইম শিল্পের লোকেরা বলছেন, এতে আমেরিকান কর্মীদের চাকরি যাবে। বিদেশি জাহাজ এসে তাদের জায়গা নেবে। অন্যদিকে ফ্রি ট্রেড সমর্থকরা বলছেন, পুরো আইনটি বাতিল করলে দীর্ঘমেয়াদে খরচ কমবে, শিপিং দক্ষ হবে। তাহলে কোন পথে যাবে আমেরিকা?
চলুন, এখানে একটু ভাবনা-চিন্তা করি। যদি জোন্স অ্যাক্ট না থাকত, তাহলে আমেরিকান রিফাইনারিগুলো সস্তায় অভ্যন্তরীণ তেল পরিবহন করতে পারত। পূর্ব উপকূল থেকে পশ্চিম উপকূলে তেল চলাচল সহজ হতো। শিপইয়ার্ডগুলো বিদেশি প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারলেও, সামগ্রিক অর্থনীতিতে খরচ কমত। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে? যুদ্ধকালীন সময়ে দেশীয় শিপিং শিল্প না থাকলে বিপদ হতে পারে। তাই আইনটি রক্ষা করার যুক্তিও আছে। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত একটি মধ্যপথ—সাময়িক স্বস্তি দিয়ে দেখা। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে গ্যাসের দাম কমবে না।
এখন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। ক্যালিফর্নিয়া, নিউইয়র্ক বা টেক্সাসের একজন ড্রাইভার প্রতিদিন গ্যাস পাম্পে দাঁড়িয়ে ভাবছেন—কবে দাম কমবে? ট্রাম্পের ঘোষণায় তাঁরা হয়তো আশাবাদী হয়েছেন। কিন্তু যদি এক পেনিও না কমে, তাহলে কী হবে? এই সংকট শুধু গ্যাস নয়, সার ও কয়লার দামও বাড়াবে। কৃষকদের খরচ বাড়বে, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রভাবিত হবে। পুরো অর্থনীতিতে একটি ঢেউ তৈরি হবে। ইরান যুদ্ধের কারণে এই ঢেউ আরও বড়। স্ট্রেইট অব হরমুজ বন্ধ থাকলে তেলের সরবরাহ কম, দাম বাড়বে। ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, তারা সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করছে। কিন্তু কতদিন?
আরও একটি দিক—পরিবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তা। জোন্স অ্যাক্ট দেশীয় শিল্প রক্ষা করে, যা যুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি জাহাজ ব্যবহার করলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, অদক্ষতার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি। এই দ্বন্দ্বটি আমেরিকার অর্থনীতির একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত এই দ্বন্দ্বকে সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে, কিন্তু সমাধান করেনি।
উপসংহারে বলা যায়, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ একটি সাহসী চেষ্টা। তিনি গ্যাসের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে চাইছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ‘ম্যাজিক’ নয়। ইরান যুদ্ধের আগুন যতক্ষণ জ্বলবে, ততক্ষণ গ্যাসের দাম কমবে না। জোন্স অ্যাক্ট স্থগিত করে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য হয়তো পুরো আইনটি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। আমেরিকানরা এখন অপেক্ষা করছে—দাম কমবে কি না। যদি না কমে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে: এই ওয়েভার কি শুধুই একটি রাজনৈতিক খেলা?
এই বিষয়টি নিয়ে আরও অনেক কথা বলা যায়। জোন্স অ্যাক্টের ইতিহাস, আমেরিকার শিপবিল্ডিং শিল্পের পতন, ফ্রি ট্রেড বনাম প্রোটেকশনিজমের দ্বন্দ্ব, ইরান যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি বড় অর্থনৈতিক গল্প। ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত হয়তো স্বল্পমেয়াদে কিছু স্বস্তি দেবে, কিন্তু সত্যিকারের সমাধান চাইলে বিশ্ববাজারের সঙ্গে লড়াই করতে হবে, ইরানের সঙ্গে কূটনীতি করতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ আইনগুলোকে আধুনিক করতে হবে। আমেরিকানরা এখন পাম্পে দাঁড়িয়ে ভাবছেন—পরের মাসে দাম কমবে তো? ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ সেই উত্তরের অংশ, কিন্তু পুরো উত্তর নয়।