বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি যেন একটা আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এখন ছড়িয়ে পড়েছে সরাসরি আমেরিকার মাটিতে। সাম্প্রতিক খবরে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) একটি অত্যন্ত গুরুতর সতর্কতা জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, ইরানের কর্মকর্তারা গোপনে আলোচনা করেছেন যে, তারা আমেরিকার উপকূলের কাছে একটি জাহাজ থেকে ড্রোন ছেড়ে ক্যালিফর্নিয়ার অজ্ঞাত স্থানে হামলা চালাতে পারে। এই পরিকল্পনা শুধুমাত্র তখনই কার্যকর হবে যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। এই খবরটি এখন বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, কারণ গালফ অঞ্চলের যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে এবং উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।
এই সতর্কবার্তাটি ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ক্যালিফর্নিয়ার বিভিন্ন পুলিশ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এফবিআইয়ের বুলেটিনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে: “আমরা সাম্প্রতিক তথ্য পেয়েছি যে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে ইরান অভিযোগ অনুসারে একটি আকস্মিক হামলার পরিকল্পনা করেছে। এতে অজ্ঞাত জাহাজ থেকে ইউনম্যান্ড এরিয়াল ভেহিকল (ড্রোন) ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলের কাছে থেকে ক্যালিফর্নিয়ার নির্দিষ্ট নয় এমন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার চেষ্টা করা হতে পারে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালায়।” তবে এফবিআই স্বীকার করেছে যে, এই হামলার সময়, পদ্ধতি, লক্ষ্যবস্তু বা দায়ী ব্যক্তিদের সম্পর্কে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য নেই। এটি এখনও অপ্রমাণিত এবং সতর্কতামূলক তথ্য হিসেবে বিবেচিত।
এই পরিস্থিতির পটভূমিতে গালফ অঞ্চলের যুদ্ধের কথা বলতে হয়। যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে চলছে। ইরান হরমুজ প্রণালীতে তিনটি কার্গো জাহাজে আক্রমণ চালিয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে যে, জাহাজগুলো সতর্কতা উপেক্ষা করেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সতর্ক করে বলেছে যে, হরমুজ প্রণালীর বন্দর এলাকায় সাধারণ নাগরিকদের যাওয়া উচিত নয়। তারা আরও বলেছে, ইরানের নৌবাহিনীর কার্যক্রমের কারণে এলাকাটি বিপজ্জনক। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আমেরিকার মাটিতে হামলার বিষয়ে চিন্তিত নন। কিন্তু এই সতর্কতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, যুদ্ধের প্রভাব এখন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) এর ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস অফিসের একটি আলাদা থ্রেট অ্যাসেসমেন্টে বলা হয়েছে, ইরান এবং তার সহযোগী গ্রুপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে সীমিত এবং লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালাতে পারে। তবে বড় ধরনের আক্রমণের সম্ভাবনা কম। এই মূল্যায়ন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরানের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, তারা প্রতিশোধমূলক হামলায় দক্ষ। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলেইমানির হত্যার পর তারা প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে। এখন যুদ্ধের মধ্যে এই ধরনের পরিকল্পনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ক্যালিফর্নিয়া কেন টার্গেট? এই প্রশ্ন অনেকের মনে। ক্যালিফর্নিয়া আমেরিকার সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য, অর্থনৈতিক কেন্দ্র এবং প্রযুক্তির হাব। লস অ্যাঞ্জেলেস, সান ফ্রান্সিসকো, সিলিকন ভ্যালি – এসব জায়গা যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে প্রভাব বিশাল হবে। তবে এফবিআই বলেছে, লক্ষ্যবস্তু নির্দিষ্ট নয়। এটি হয়তো সামরিক ঘাঁটি, বন্দর বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হতে পারে। ড্রোন থেকে হামলা এখন আধুনিক যুদ্ধের একটি সস্তা এবং কার্যকর উপায়। ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি বেশ উন্নত – তারা ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সরবরাহ করেছে। একটি জাহাজ থেকে ড্রোন লঞ্চ করা সম্ভব, যদিও প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকার উপকূলে পৌঁছানো চ্যালেঞ্জিং।
এই খবরের পর ক্যালিফর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম বলেছেন, তিনি এই তথ্য সম্পর্কে অবগত। তিনি বলেছেন, “আমরা এই তথ্য জানি।” অনেক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বলছে, এটি এখনও নিশ্চিত নয় এবং কোনো আসন্ন হুমকি নেই। তবে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। এমনকি অস্কারের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে এই সতর্কতার কারণে।
এই ঘটনা বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে চিন্তা করতে বাধ্য করছে। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে প্রক্সি হামলা বা এ ধরনের গোপন পরিকল্পনা বাড়তে পারে। ইরানের সাইবার আক্রমণ, প্রভাব বিস্তার এবং ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশনের ইতিহাসও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এফবিআই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের হুমকি মোকাবিলা করছে।
সারাংশে বলা যায়, এই সতর্কবার্তা যুদ্ধের ছায়া আমেরিকার দরজায় পৌঁছে দিয়েছে। ক্যালিফর্নিয়ার মানুষ এখন সতর্ক, কিন্তু আতঙ্কিত নয়। নিরাপত্তা বাহিনী সজাগ। বিশ্ব দেখছে, এই উত্তেজনা কোথায় গিয়ে থামবে। শান্তির আশা করা ছাড়া উপায় নেই, কিন্তু প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দূরের যুদ্ধও কখনো কখনো খুব কাছে চলে আসে।