তারেক রহমানের সাক্ষাৎকার: নির্বাসন থেকে গণতন্ত্রের আহ্বান, ভারতের সাথে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
লন্ডন থেকে ঢাকার হৃদয়স্পন্দনে এক অপেক্ষিত কণ্ঠস্বর ফিরে এসেছে। প্রায় দুই দশকের নির্বাসিত জীবনের পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিবিসি বাংলার সামনে মুখোমুখি হয়েছেন। এই সাক্ষাৎকার শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক জ্বলন্ত দলিল। সংস্কারের দাবি, ভারতের সাথে সম্পর্কের জটিলতা এবং আগামী নির্বাচনের রূপরেখা—এসব নিয়ে তাঁর কথাগুলো যেন একটা নতুন স্বাধীনতার সূচনা ঘোষণা করছে।
দীর্ঘ ১৭ বছরের স্তব্ধতা ভেঙে তারেক রহমানের এই সাক্ষাৎকার (৫ অক্টোবর প্রকাশিত প্রথম পর্ব) বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন গতি দিয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নির্বাসিত তিনি, ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে দূর থেকে সংগঠিত করেছেন। কিন্তু এবার তাঁর কণ্ঠে শুধু দূরত্বের বেদনা নয়, ফিরে আসার দৃঢ়তা। "কিছু সংগত কারণে এখনও দেশে ফেরা হয়নি, তবে সময় এসে গেছে। ইনশাআল্লাহ, দ্রুতই ফিরব," বলে তিনি বিবিসি বাংলার সম্পাদক মীর সাব্বির এবং সাংবাদিক কাদির কল্লোলের প্রশ্নে উত্তর দেন। এই কথা যেন নির্বাসনের শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম ধাক্কা।
সাক্ষাৎকারের মূলে রয়েছে সংস্কারের অটল দাবি। তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, "কথিত অল্প সংস্কার আর বেশি সংস্কারের অভিনব শর্তের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভবিষ্যত।" তিনি চান একটি পার্থক্যমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থা, যেখানে নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং ভোটারদের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিচারের প্রশ্নে তিনি বলেন, "এটি জনগণের আন্দোলনের ফলাফল। গণতন্ত্রবিরোধীদের বিচার হবেই, কিন্তু এতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা হবে।" এই কথাগুলো যেন ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের আত্মাকে পুনরুজ্জীবিত করছে।
ভারতের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি সবচেয়ে স্পর্শকাতর। বর্তমানে ভারতের সরকারকে 'স্বৈরাচারী' বলে অভিহিত করে তিনি বলেছেন, "ভারত যদি স্বৈরাচারকে আশ্রয় দিয়ে দেশের মানুষের বিরাগভাজন হয়, আমাদের কিছু করার নাই।" এখানে 'স্বৈরাচার' বলতে তিনি হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে বোঝাচ্ছেন, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তাঁর মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গভীর হলেও, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এটিকে বিষাক্ত করেছে। "আমরা চাই ভারতের সাথে ভালো সম্পর্ক, কিন্তু তা হতে হলে তারা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করবে," বলে তিনি যোগ করেন। এই বক্তব্য বাংলাদেশের যুবসমাজের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে—একদিকে প্রতিবেশী দেশের সাথে সংযুক্ততা, অন্যদিকে সার্বভৌমত্বের দাবি।
আগামী নির্বাচন নিয়েও তাঁর কথা উজ্জ্বল। "ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন হবে," বলে তিনি আগের সমাবেশে ঘোষণা দিয়েছিলেন, এবং সাক্ষাৎকারে পুনর্ব্যক্ত করেন। বিএনপির কৌশল? "দলীয় মনোনয়ন নির্বাচনভিত্তিক হবে, যাতে নতুন মুখ উঠে আসে।" প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রশ্নে তাঁর উত্তর লাজুক কিন্তু দৃঢ়: "এটি আমার সিদ্ধান্ত নয়, বাংলাদেশের জনগণের। যেখানে জনগণের সম্পৃক্ত নির্বাচন হবে, সেখানে আমি অবশ্যই অংশ নেব।" এই কথায় যেন বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের এক ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে।
তারেক রহমানের এই সাক্ষাৎকার শুধু বিএনপির জন্য নয়, সমগ্র বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক মাইলফলক। এটি দেখায় যে নির্বাসনের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে তিনি গণতন্ত্রের আলোয় ফিরছেন। দ্বিতীয় পর্ব (৭ অক্টোবর প্রকাশিত) আরও গভীরতা যোগ করবে, কিন্তু প্রথম পর্বই যথেষ্ট প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের রাজনীতি আর পুরনো দিনের মতো নয়। এখন সময় জনগণের—যারা আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড, তারা সিদ্ধান্ত নেবে। দেশ ফিরুন, তারেক রহমান; আপনার কণ্ঠ এখন আর শুধু লন্ডনের নয়, ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।