অনড় অবস্থানে নির্বাচন কমিশন, শাপলা প্রতীক না দিলে কী করবে এনসিপি?

 

শাপলা প্রতীক না দিলে কী করবে এনসিপি?

অনড় অবস্থানে নির্বাচন কমিশন, শাপলা প্রতীক না দিলে কী করবে এনসিপি?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এখন একটা ঝড়ের ছায়া ঘুরপাক খাচ্ছে। জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের পর যে নতুন আশা জেগেছিল, সেই আশার সাথে জড়িয়ে পড়েছে একটা প্রতীকের লড়াই। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যারা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মূল স্তম্ভ ছিল, তারা এখন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) একটা অদ্ভুত অনড় অবস্থানের মুখোমুখি হয়েছে। শাপলা—বাংলাদেশের জাতীয় ফুল, স্বাধীনতা ও বিপ্লবের প্রতীক—এই শাপলা প্রতীকটি তারা চায় নির্বাচনী লড়াইয়ে। কিন্তু ইসি বলছে, "না, এটা তালিকায় নেই।" এই 'না' শব্দের পিছনে কী লুকিয়ে আছে? চাপ? ষড়যন্ত্র? নাকি সাংবিধানিক জটিলতা? আর যদি শাপলা না পান, তাহলে এনসিপি কী করবে? এই প্রশ্নটাই আজ রাজনৈতিক মহলে ঝড় তুলেছে। আসুন, এই বিষয়টা বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখি, এবং চিন্তা করি—এরপরের পথ কোনটা হতে পারে।

শাপলার ইতিহাস: একটা ফুলের রাজনৈতিক যাত্রা

শাপলা শুধু একটা ফুল নয়, এটা বাংলাদেশের পরিচয়ের অংশ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এটা ছিল প্রতিরোধের প্রতীক। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে, যখন ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিল, তখন শাপলা আবার ফুটে উঠেছে—এবার নতুন প্রজন্মের হাতে। এনসিপি, যা নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদের মতো তরুণ নেতাদের দ্বারা গড়ে উঠেছে, এই ফুলটাকে তার নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে চায়। কেন? কারণ এটা তাদের আন্দোলনের প্রতিফলন। "শাপলা মানে বিপ্লব, শাপলা মানে নতুন বাংলাদেশ," বলে তারা।

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫-এ এনসিপি ইসিকে আবেদন করে, ২০০৮ সালের নির্বাচনী নিয়মের সংশোধনের মাধ্যমে শাপলা, সাদা শাপলা বা লাল শাপলা প্রতীক অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানায়। কিন্তু ইসির সিনিয়র সেক্রেটারি আখতার আহমেদ ২৩ সেপ্টেম্বরই স্পষ্ট করে বলেন, "শাপলা তালিকায় নেই, তাই সম্ভব নয়।" পরে ২ অক্টোবর, ইসি এনসিপিকে ৫০টা বিকল্প প্রতীকের তালিকা দেয়—বেগুন, বেলুন, উটপাখি, থালা-বাটি, কাপ-প্লেট। এনসিপির নেতা সারজিস আলম এটাকে 'হাস্যকর' বলে উড়িয়ে দেন। "এগুলো কী? আমরা বিপ্লবের প্রতীক চাই, এসব রান্নাঘরের জিনিস নয়!" তাঁর কথায়।

ইসির এই অনড়তা কেন? অফিসিয়াল কারণ: শাপলা ১১৫টা সংরক্ষিত প্রতীকের তালিকায় নেই। কিন্তু এনসিপি বলছে, এর পিছনে রাজনৈতিক চাপ। একটা বড় দলের বিরোধিতা, ষড়যন্ত্রের গন্ধ। মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যও শাপলা ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, যাতে এনসিপি পায়। কিন্তু ইসি নড়ছে না। ৬ অক্টোবর, সারজিস আলম নাটোরে বলেন, "যদি এই কমিশন শাপলা না দেয়, তাহলে আগামী নির্বাচনের যোগ্যতা হারাবে।" এটা শুধু প্রতীকের লড়াই নয়, গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের পরিবেশনা।

ইসির অনড় অবস্থান: নিরপেক্ষতা নাকি পক্ষপাত?

নির্বাচন কমিশনকে বলা হয় গণতন্ত্রের রক্ষক। কিন্তু এখানে কী ঘটছে? জুলাইয়ের পর নতুন ইসি গঠিত হয়েছে, কিন্তু তারা পুরনো নিয়মের জালে আটকে আছে। চিফ ইলেকশন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, "আলোচনা হবে," কিন্তু সিদ্ধান্ত নেই। সেক্রেটারি আখতার আহমেদের কথায়, "তালিকা থেকে বেছে নিন।" কিন্তু এনসিপির আবেদনে বলা হয়েছে, এই অস্বীকৃতি 'আইনি ভিত্তিহীন, শত্রুতাপূর্ণ এবং ইচ্ছাকৃত।' এটা নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তোলে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শাপলা দিলে এনসিপির জনপ্রিয়তা বাড়বে, যা অন্য দলগুলোর জন্য হুমকি। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে, অনেকে এনসিপির পক্ষে—কার্টুন থেকে শুরু করে মিম পর্যন্ত। কিন্তু ইসি যদি অনড় থাকে, তাহলে এটা শুধু এনসিপির সমস্যা নয়। এটা সব নতুন দলের জন্য সতর্কবার্তা: 'পুরনো নিয়ম মানো, না হলে বাইরে থাকো।' জুলাইয়ের চেতনা কি এভাবে দমিয়ে রাখা যায়? নাকি এটা গণতন্ত্রের পরীক্ষা?

শাপলা না পেলে এনসিপির পথ: বিকল্প কী কী?

এখন মূল প্রশ্ন: শাপলা না দিলে এনসিপি কী করবে? দলের নেতারা বলছেন, "আমরা শাপলা ছাড়া নির্বাচনে নামব না।" কিন্তু বাস্তবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতীকের গুরুত্ব অপরিসীম। গ্রামের ভোটাররা প্রতীক চিনে ভোট দেয়, নায় নাম। তাই এটা ছাড়া লড়াই কঠিন। তবু, সম্ভাব্য পথগুলো নিয়ে চিন্তা করা যাক।

প্রথমত, আইনি লড়াই: এনসিপি ইতিমধ্যে ইসির বিরুদ্ধে আবেদন করেছে। পরবর্তী ধাপ হতে পারে হাইকোর্টে রিট দায়ের। সাংবিধানিক অধিকারের ভিত্তিতে তারা দাবি করতে পারে যে, প্রতীক বিতরণে নিরপেক্ষতা লঙ্ঘিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অতীতে অন্য দলগুলো (যেমন বিএনপি বা আওয়ামী লীগ) প্রতীকের জন্য আদালতে গিয়ে জিতেছে। যদি হাইকোর্ট শাপলা অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ দেয়, তাহলে ইসির অনড়তা ভেঙে যাবে। কিন্তু এটা সময়সাপেক্ষ—নির্বাচনের আগে শেষ হবে কি না, সন্দেহ।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি: এনসিপি যদি রাস্তায় নামে, তাহলে জুলাইয়ের ছাত্র-জনতা আবার জেগে উঠতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন, র‍্যালি, সিভিল সোসাইটির সাথে জোট—এসব দিয়ে ইসির উপর চাপ বাড়ানো যায়। সারজিস আলমের কথায়, "আমরা দেখব, নির্বাচন কীভাবে হয়।" এটা হুমকি নয়, সতর্কতা। যদি শাপলা না পান, তারা বয়কটের হুমকি দিতে পারে, যা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। কিন্তু এটা ঝুঁকিপূর্ণ—জনপ্রিয়তা হারানোর আশঙ্কা আছে।

তৃতীয়ত, বিকল্প প্রতীক গ্রহণ: যদিও এনসিপি এখন 'হাস্যকর' বলে উড়িয়ে দিচ্ছে, ভবিষ্যতে যদি চাপ বাড়ে, তারা বেছে নিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, 'দোয়েল' (জাতীয় পাখি) বা 'পেন'—যা তাদের তরুণ-শিক্ষিত ইমেজের সাথে মানানসই। কিন্তু এটা তাদের মূল দাবি থেকে সরে যাওয়া মানে আত্মসমর্পণ। নাহিদ ইসলাম বলেছেন, "আমরা শাপলা ছাড়া এগোব না।" তাই এটা শেষ অপশন।

চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদী কৌশল: নির্বাচনের বাইরেও পথ আছে। এনসিপি স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে শক্তি গড়তে পারে, যেখানে প্রতীকের নিয়ম কম কঠোর। অথবা, অন্য ছোট দলের সাথে জোট করে লড়াই—যেমন নাগরিক ঐক্যের সাথে। এতে শাপলা না পেলেও, তাদের ভোটব্যাঙ্ক বজায় থাকবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জনগণের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো। সোশ্যাল মিডিয়ায় #ShaplaForNCP ক্যাম্পেইন চলছে ইতিমধ্যে। এটা দিয়ে তারা দেখাতে পারে যে, প্রতীক না পেলেও চেতনা অটুট।

এরপর কী? গণতন্ত্রের পরীক্ষা

শাপলা প্রতীকের লড়াই শুধু এনসিপির নয়, বাংলাদেশের নতুন রাজনীতির পরীক্ষা। জুলাইয়ের পর আমরা স্বপ্ন দেখেছি একটা নিরপেক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের। কিন্তু ইসির এই অনড়তা যদি চলতে থাকে, তাহলে সেই স্বপ্ন ফুরিয়ে যাবে। এনসিপি যদি শাপলা না পেয়ে হাল ছাড়ে, তাহলে তরুণ প্রজন্মের হতাশা বাড়বে। আর যদি লড়াই করে, তাহলে হয়তো একটা নতুন অধ্যায় শুরু হবে—যেখানে নিয়ম বদলাবে, প্রতীকগুলো আরও গণতান্ত্রিক হবে।

আমরা সবাই জানি, রাজনীতি শুধু চেয়ার নয়, প্রতীকের লড়াই। শাপলা না পেলে এনসিপি হয়তো আইনের পথে যাবে, হয়তো রাস্তায় নামবে, কিন্তু তারা থামবে না। কারণ, শাপলা ফুলটা জলের উপর ভাসে—চাপে ভেঙে যায় না, বরং আরও উজ্জ্বল হয়। এনসিপির লড়াইও তাই। এটা আমাদের সবার লড়াই—একটা নতুন, স্বচ্ছ বাংলাদেশের জন্য। আসুন, আমরা সবাই এই লড়াইয়ে সাথী হই। কারণ, গণতন্ত্র তো ফুলের মতোই—যত চাপ দাও, তত ফুটে ওঠে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন