পরোক্ষ সংলাপে ইসরায়েল-হামাস, শান্তির পথে কি নতুন দিগন্ত?

 

পরোক্ষ সংলাপে ইসরায়েল-হামাস, শান্তির পথে কি নতুন দিগন্ত?
পরোক্ষ সংলাপে ইসরায়েল-হামাস (Image credit REUTERS)


পরোক্ষ সংলাপে ইসরায়েল-হামাস, শান্তির পথে কি নতুন দিগন্ত
?

প্রায় দুই বছর ধরে গাজা উপত্যকা যেন এক দীর্ঘতম দুঃস্বপ্ন হিসেবে বিরাজ করছে — যুদ্ধ, ধ্বংস, ক্ষুধা, ও অগণিত দুর্ভোগের মাঝেই মানুষ ডানপিটোল আহ্বান জানাচ্ছে শান্তির। যুদ্ধবিরতির নামে কয়েক দফা আস্থা পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা হলেও, সঠিক ও স্থায়ী সমাধানের পথে পদক্ষেপ সব সময়ই আটকে গেছে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাধায়। এখন, একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে সংঘাত: সরাসরি নয়, বরং পরোক্ষ বৈঠক ও মধ্যস্থতা — যেখানে বেশ কিছু শক্তি, পরিকল্পনা ও সংকেত মিলিত হয়েছে একটি ‘সমঝোতার সম্ভাবনা’ তৈরি করার জন্য।

এই পটভূমিতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প — পুরোনো-নতুন রাজনৈতিক প্রভাবশালী — এক একধরণের বিকল্প পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন, যার ভিত্তিতে তিনি মনে করছেন, সম্ভবত এইবার একটা চুক্তি হতে পারে। তাঁর এই ভাবনা অনেকেই স্বাগত বলছেন, আবার যথেষ্ট সন্দেহ ও প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। আসুন গভীরে চলি — কীভাবে এ আলোচনাগুলি গড়ে উঠেছে, কী সমস্যাগুলি এখনও মেরুদণ্ডের মতো দাঁড়িয়ে আছে, এবং কিভাবে ট্রাম্পের ভূমিকা ও আগ্রহ এই সমঝোতার সম্ভাবনাকে দূর থেকে তরল করছে।


আলোচনার সূচনা: সরাসরি নয়, পরোক্ষ — মধ্যস্থতার নিখুঁত শৈলী

ইসরায়েল ও হামাস এখনও সরাসরি টেবিলে বসে কথা বলছেন না। বর্তমান আলোচনাগুলি হচ্ছেন মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে — বিশেষ করে মিশর ও কাতার — যারা একটি “মেডিয়েটর” অবস্থান গ্রহণ করছেন।  এমন আলোচনা শুরু হয় শার্ম এল-শেইখ (Sharm el-Sheikh, মিশরে) থেকে, যেখানে দুই পক্ষ একটি নির্ধারিত পরিকল্পনার মূল নীতিগুলোতে একমত হয়েছে।  আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে — যুদ্ধবিরতি, বন্দী বিনিময়, মানবিক ত্রাণ প্রবেশ, এবং একটি প্রাথমিক উপসীমান্ত (initial withdrawal) পরিকল্পনা।

দু’টি বিষয়ই স্পষ্ট:

  1. পক্ষগুলোর গম্ভীর ইচ্ছে — আলোচনাগুলোর সূচনাতেই বলা হয়েছে, উভয় পক্ষই প্রস্তাবিত নীতিগুলোর মূল ভিত্তিগুলোকে গৃহীত করেছে।

  2. বাঁধাগুলি অব্যাহত — আলোচনার মধ্যে এমন বিষয় রয়েছে, যা অতীতে সমঝোতা বিফল করেছে — যেমন ইসরায়েল সেনার প্রত্যাহার, হামাস বিরোধী অস্ত্র নিবারণ বা নিষ্ক্রিয়করণ (disarmament), এবং বিনিময়ে বন্দীদের মুক্তি।

এক কথায় — এই আলোচনাগুলি হোক “আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা” না, তবুও তারা একটি অস্বীকারযোগ্য গুরুত্ব বহন করে: কারণ এখানে আছে অনুভবযোগ্য ইচ্ছা ও প্রথম ধাপের প্রস্তুতি।


চ্যালেঞ্জের পাহাড়: যেখানে আটকে যেতে পারে সমঝোতা

যদিও আলোচনার শুরুটা ইতিবাচক ছিল, কিন্তু সফল সমঝোতার পথে বড় বড় প্রতিবন্ধকতা এখনও প্রবলভাবে দাঁড়িয়ে:

১. প্রত্যাহার ও সীমান্ত প্রভাব

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে একটি “initial withdrawal line” (প্রাথমিক প্রত্যাহার সীমানা) প্রস্তাব এসেছে — যেখানে 🇮🇱 কিছু সামরিক ইউনিট সরে যেতে পারে, কিন্তু পুরো গাজা থেকে সরে যাওয়া হবে না।  তবে, এ ধরণের পদক্ষেপ হামাসের পক্ষ থেকে না-ন-লাভ বলে দেখা যেতে পারে যদি এই প্রত্যাহার পর্যাপ্ত না হয় বা তা নির্ধারণ করা শর্তসাপেক্ষ হয়। (Reuters)

২. অস্ত্রনির্বাসন (Disarmament)

হামাসের একটি নির্ধারিত অস্ত্রশক্তি রক্ষা ও “সশস্ত্র প্রতিরোধ ক্ষমতা” দাবি রয়েছে, যা তারা কঠোরভাবে বলেছে তারা সরাসরি ছাড়বে না।  অন্যদিকে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছেন — শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেই সশস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয়করণ জরুরি। (Al Jazeera) এই দ্বন্দ্বই অতীতে আলোচনাগুলিকে বিঘ্ন করেছে।

৩. বিশ্বস্ততা ও গ্যারান্টি

হামাসের পক্ষ থেকে এক উদ্বেগ যে — যদি তারা বন্দীদের মুক্তি দেয়, তাহলে ইসরায়েল কি শর্তসাপেক্ষভাবে চুক্তি মেনে চলবে? এই সন্দেহ উত্তর বাধ্য করতে পারে যে মধ্যবর্তী কোনো গারান্টি বা তৃতীয় পক্ষের নজরদারি হবে কি না। 

৪. রাজনৈতিক বাধা ও স্বীকারোক্তি

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তাঁর গভর্মেন্টের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে — কিছু ধারক গোষ্ঠী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে, আবার কিছু অংশ সংকট অবসান ও বন্দীদের ফিরিয়ে আনার পক্ষে।এছাড়া, জামারাস এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর মধ্যে সম্মিলিত সিদ্ধান্তের সঙ্কটও থাকতে পারে।

৫. সময়সীমা ও বাস্তবিক ক্রম

ট্রাম্প পরিকল্পনায় একটি ৭২ ঘণ্টার সময়ে বন্দীদের ফিরিয়ে দেওয়া এবং তাৎক্ষণিক প্রত্যাহারসহ অন্যান্য ধাপ নেওয়ার প্রস্তাব রেখেছেন। (Wikipedia) কিন্তু বাস্তবতায়, মৃত বন্দীদের দেহ সংগ্রহ, স্থান নির্ধারণ, সেনাবাহিনী সরানো — এসব কাজগুলো এত দ্রুত করা কঠিন। 

সুতরাং, এই বাধাগুলো ছাড়া আলোচনাগুলি কোনও সড়কচিহ্নহীন অঞ্চল নয় — বরং একটি যুদ্ধমাঠের মতো যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ সুক্ষ্ম হলো।


ট্রাম্প ও ২০-পয়েন্ট পরিকল্পনা: নতুন রূপ, পুরাতন কৌশল

ট্রাম্প ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি ২০-পয়েন্ট গাজা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, যেখানে যুদ্ধবিরতি, বন্দী বিনিময়, গাজা থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহার, হামাসের অস্ত্র ধ্বংস, এবং একটি মধ্যবর্তী প্রশাসনিক কাঠামো (transitional governance) স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে।  এই পরিকল্পনায় “Gaza International Transitional Authority” প্রস্তাব রয়েছে — যেখানে তৃতীয় পক্ষের নজরদারি ও আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ থাকছে। 

ট্রাম্প সংবাদদাতাদের বলেছেন, আলোচনাগুলিতে “একটি চুক্তির চমৎকার সুযোগ” রয়েছে।  তিনি দাবি করেছেন, হামাস ইতিমধ্যে “মহান কিছু বিষয়” মেনে নিচ্ছে।  সত্ত্বেও, তিনি সতর্কও করেছেন — “I have red lines” —certain শর্ত পূরণ না হলে চুক্তি সম্ভব হবে না। 

ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা এবং মধ্যস্থতার দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন তৈরি করেছে — সমর্থন পাওয়া যায় পশ্চিমা ও আরব দেশগুলোর কাছ থেকেও। (Wikipedia) তবে সমালোচকরা বলছেন — এটি একটি একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে হামাস ও ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক স্বীকৃতি ও তাদের স্বায়ত্তশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট অংশ পায়নি।


সম্ভাবনাময় চুক্তির রূপরেখা: শান্তির দিকেই এক ঝলমল

যদি আলোচনাগুলি সুষম ব্যালান্স বজায় রাখতে পারে, তাহলে এমন একটি চুক্তির রূপরেখা গড়ে উঠতে পারে:

  • যুদ্ধবিরতি — আলোচনারই প্রথম ভিত্তি হিসেবে

  • অনুপ্রবেশ ত্রাণ ও খাদ্যসাহায্য — গাজার মানুষকে তীব্র সঙ্কট থেকে উদ্ধার

  • বন্দী বিনিময় — জীবিত ও মৃত বন্দী উভয়ের রূপায়ণ

  • ধাপে ধাপে প্রত্যাহার — একটি “yellow line” সীমানা থেকে শুরু করে সামগ্রিক প্রত্যাহারে উন্নীত

  • হামাসের অস্ত্র ও সশস্ত্র অবকাঠামোর ধ্বংস (বা নিষ্ক্রিয়করণ)

  • একটি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানমূলক ব্যবস্থাপনা — যেখানে বিশ্ব সম্প্রদায় অংশগ্রহণ করবে

  • গাজা পুনর্গঠন — অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বেসামরিক কাজের পরিকল্পনা

  • রাজনৈতিক সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান — ফিলিস্তিনের স্বায়ত্তশাসন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তা ভারতের মতো প্রসারিত বিষয়

তবে এমন একটি সমঝোতা পুরোপুরি সফল হবে কি না — তা নির্ভর করবে আলোচনাকারীদের রাজনৈতিক প্ররোচনা, সংকল্প, এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টি-সহায়তার উপর।


আশাবাদ ও সন্দিহান দৃষ্টিভঙ্গি

ট্রাম্পের বক্তব্য অনেকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাঁর “really good chance” বলে যে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন — তা সাংবাদিকদের সামনে একটি ক্রিয়াশীল সংকেত।  এছাড়া তিনি বলছেন, “Hamas agrees to very important things, এবং এই মুহূর্তটিকে একটি সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। 

তবে কিছু শঙ্কাও রয়েছে:

  • দলগত বিভাজন — ইসরায়েলের রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতির পক্ষে ও বিরुद्धের মাঝে দ্বন্দ্ব

  • হামাসের বিভিন্ন শাখার ভিন্নভিন্ন মনোভাব — গাজা অভ্যন্তরে এবং বহির্বিশ্বে

  • প্রতিজ্ঞা ও বাস্তবায়ন ফাঁক — সমঝোতার কথায় ও বাস্তবের কর্মকাণ্ডে ফারাক

  • আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা — চুক্তি মেনে চলা এবং তদারকির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

ফলে, যদিও চুক্তির সম্ভাবনা উজ্জ্বল, সেটি কোনও নিশ্চয়তা নয়। আলোচনাগুলির প্রতিটি ধাপেই সতর্কতা, নমনীয়তা ও আন্তঃআস্থা তৈরি করতে হবে।


ইসরায়েল ও হামাসের সংগ্রাম শুধু ভূ-রূপান্তর কিংবা সামরিক সংঘর্ষের গল্প নয় — এটি একটি মানুষের দুঃখ, ক্ষয়, প্রত্যাশা ও চাওয়ার গল্প। তারা যখন অস্ত্রকে সাময়িক শান্তিতে পরাজিত করতে পারে, তখন কূটনীতি, আলোচনার সূতিকাগার হতে পারে — যদি তার ভিত্তি দৃঢ় হয়।

ট্রাম্প, তাঁর ২০-পয়েন্ট পরিকল্পনা, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ভূমিকা, ও আলোচনাকারীদের মনোভাব — এগুলো একত্রিত হলে এই ‘পরোক্ষ আলোচনা’ পরিণত হতে পারে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলিল। ঠিক যেমন একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের ধুলো থেকে একটি নতুন নগরীর পরিকল্পনা গড়ে ওঠে — ধাপে ধাপে, নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে যুদ্ধ করে।

সম্ভাবনা আছে — চুক্তি হতে পারে। তবে সেই চুক্তি যদি হয় সত্যিকারের শান্তির ভিত্তি, তা হবে প্রতিটি অংশের আন্তরিক অংশগ্রহণ, নিরাপত্তার গ্যারান্টি, বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গির সংমিশ্রণ। যুদ্ধবিরতির চিহ্ন শুধু অস্ত্র নীরবতা নয় — এটি একটি নতুন আলো বিকাশের প্রতীক হতে পারে, যদি সকলে সম্মত হয় এক নতুন যাত্রার শুরুর ছোঁয়ায়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন