ঢাকার মিরপুরে আশ্রয় নেওয়া ভারতের সাকিনা বেগমকে যেভাবে খুঁজে পেল বিবিসি: এক অজানা যাত্রার অবিশ্বাস্য কাহিনি
ঢাকার হৈচৈপূর্ণ রাস্তায়, যেখানে রিকশার টুংটাং শব্দ মিশে যায় দূরের ইজ্জতনগরের ট্রেনের হুইসেলে, সেখানে মিরপুরের ঘিঞ্জি গলিতে একটি ছোট্ট বাসা লুকিয়ে আছে। এই বাসায়, চার মাস ধরে একজন বৃদ্ধা নীরবে আশ্রয় নিয়েছিলেন—তাঁর নাম সাকিনা বেগম। ৬৫ বছরের এই মহিলা ভারতের আসামের নলবাড়ি জেলার বরকুরা গ্রামের সাধারণ গৃহিণী। কিন্তু তাঁর জীবনের এই অংশটা যেন একটা অবিশ্বাস্য উপন্যাসের মতো—পুলিশের হাতে ধরা, অজানা সীমান্ত পারাপার, এবং শেষে বিবিসির তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানের ফলে আলোকিত হওয়া। আজ আমরা সেই গল্প বলব, যা শুধু সাকিনা বেগমের নয়, বরং দুই দেশের মানুষের মানবিকতা এবং সীমান্তের কঠোর বাস্তবতারও একটা জীবন্ত চিত্র।
সাকিনা বেগমের শুরুর অধ্যায়: আসামের শান্ত গ্রাম থেকে অন্ধকার যাত্রা
২০২৫ সালের ২৫ মে, আসামের সবুজ চা-বাগান ঘেরা নলবাড়ি জেলার বরকুরা গ্রামে সকালের নরম আলোয় সাকিনা বেগম তাঁর ছোট্ট মাটির বাড়িতে ছেলে-মেয়েদের জন্য চাল-ডাল রাঁধছিলেন। তাঁর স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন, আর ছেলে-মেয়েরা গ্রামের কাছাকাছি কাজ করে পরিবার চালায়। হঠাৎই পুলিশ এসে ঘরে ঢোকে। "থানায় একটা সই করাতে হবে, আন্টি," বলে তারা সাকিনাকে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই 'সই' কখনো হয়নি। পরিবারের কাছে শুধু একটা ফোন কল আসে: "তোমাদের মা অবৈধ অভিবাসী, তাকে পুশ-ইন করা হচ্ছে।" আসামের NRC (ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস) এবং CAA (সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট) নিয়ে চলা বিতর্কের মধ্যে এমন ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। সাকিনার পরিবার দাবি করে, তাঁর নাগরিকত্বের সব কাগজপত্র ঠিক আছে, কিন্তু পুলিশের হাতে তিনি অদৃশ্য হয়ে যান।
সেইদিন থেকে সাকিনার যাত্রা শুরু হয় একটা অজানা অন্ধকারে। পুলিশ তাঁকে সীমান্তের দিকে নিয়ে যায়, যেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে আসামের লম্বা, জঙ্গলময় সীমান্ত রয়েছে। রাতের অন্ধকারে, হাতে একটা ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে—যাতে ছিল শুধু দুটো শাড়ি আর একটা পুরনো ছবি—সাকিনাকে 'পুশ-ইন' করা হয়। অর্থাৎ, জোর করে সীমান্ত পার করে দেওয়া হয় বাংলাদেশের দিকে। সাকিনা পরে বলেন, "আমি কাঁদছিলাম, বলছিলাম আমার ছেলে-মেয়েরা কোথায়? কিন্তু তারা শুধু বলল, 'যাও, এটা তোমাদের দেশ।'" এই পুশ-ইনের শিকার হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা, আসামের এই অঞ্চলে। কিন্তু সাকিনার মতো বৃদ্ধাদের জন্য এটা শুধু দেশত্যাগ নয়, এটা পরিবার থেকে বিচ্ছেদ।
সীমান্ত পার হয়ে সাকিনা পড়েন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটা গ্রামে। ভয়ে, ক্লান্তিতে তিনি হাঁটেন দিনের পর দিন। খাবারের জন্য ভিক্ষা করেন, রাত কাটান গাছতলায়। অবশেষে, ঢাকার দিকে যাত্রা করেন একটা লরিতে লুকিয়ে। ঢাকায় পৌঁছে মিরপুরের একটা ঘিঞ্জি বস্তিতে আশ্রয় নেন। সেখানকার একটা দরিদ্র পরিবার—যারা নিজেরাই দুপুর-রাতের খাবারের জন্য চিন্তায় থাকে—তাঁকে আশ্রয় দেয়। "তিনি আমাদের মায়ের মতো," বলে সেই পরিবারের গৃহিণী পরে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন। সাকিনা সেখানে চুপচাপ থাকেন, কাজ করেন—ঘর ঝাড়ু দেন, ছোট ছেলেমেয়েদের খেতে সাহায্য করেন। কিন্তু তাঁর চোখে সবসময় একটা অদ্ভুত খালি দৃষ্টি, যেন দূরের আসামের সবুজ মাঠগুলো খুঁজছে।
মিরপুরের ছায়াময় জগৎ: আশ্রয়ের পেছনে লুকিয়ে থাকা জীবন
মিরপুর, ঢাকার এই বিশাল শহরাঞ্চল, যেন একটা জটিল জাল। সেকশন ১ থেকে ১৪ পর্যন্ত বিস্তৃত এই এলাকায় মিশে আছে ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই। কিন্তু সেকশন ১০-এর কাছাকাছি যে ঘিঞ্জি গলিগুলো, সেগুলো যেন ভুলে যাওয়া কোণ। সরু রাস্তায় পড়ে থাকে প্লাস্টিকের বোতল আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে বাচ্চাদের খেলনা। এখানকার বাসাগুলো ছোট্ট টিনের, যেখানে একটা পরিবারের সব সুখ-দুঃখ মিশে থাকে। সাকিনা এমনই একটা বাসায় এসে থাকেন। তাঁর আশ্রয়দাতা পরিবারের পুরুষটি একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। তার স্ত্রী বাড়িতে সেলাই করে। তাদের দুটো ছেলে, যারা স্কুল যায়, সাকিনাকে 'দাদি' বলে ডাকে।
কিন্তু এই আশ্রয়ের পেছনে ছিল ভয়। সাকিনা জানতেন, অবৈধভাবে দেশে ঢোকা মানে যেকোনো সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়া। তবু তিনি চুপ থাকেন। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ? অসম্ভব। ফোন নেই, টাকা নেই। শুধু রাতে স্বপ্নে ছেলে-মেয়েদের মুখ দেখেন। মিরপুরের এই জীবন যেন একটা নীরব যুদ্ধ—প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই। স্থানীয়রা বলেন, এমন অজানা মানুষ এখানে অনেক আসে, সীমান্তের ভুয়া প্রতিধ্বনিতে। কিন্তু সাকিনার মতো কেউ যদি কথা না বলে, তাহলে তারা অদৃশ্য হয়ে যায় শহরের ভিড়ে।
বিবিসির অনুসন্ধান: একটা খোঁজের অ্যাডভেঞ্চার যা সীমান্ত পার হয়
এবার আসল গল্পের মূল অংশ—বিবিসি কীভাবে সাকিনাকে খুঁজে পেল? ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে, বিবিসি বাংলার সাংবাদিক তাফসীর বাবু আসামের NRC-সংক্রান্ত একটা রিপোর্ট তৈরি করছিলেন। সেখানে একটা টিপ অফ আসে: "একজন বৃদ্ধা, আসাম থেকে পুশ-ইন করা, ঢাকায় মিরপুরে আশ্রয় নিয়েছে।" এটা কোনো সাধারণ টিপ নয়। স্থানীয় একটা NGO থেকে আসে, যারা সীমান্তের শরণার্থীদের সাহায্য করে। তাফসীর আর তাঁর টিম সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করেন। প্রথমে যোগাযোগ হয় মিরপুরের স্থানীয় থানা—ভাষানটেক—এর সঙ্গে। "একজন ভারতীয় বৃদ্ধা এখানে আছে কি?" প্রশ্নটা ফেলা হয়। থানা বলে, "জানি না, কিন্তু চেক করব।"
কিন্তু বিবিসির সাংবাদিকরা থামেন না। তারা মিরপুরের গলিগুলোয় নামেন—সেকশন ১০-এর কাছে, যেখানে বস্তি আর মিশে আছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন, ছবি দেখান আসামের গ্রামের। "এমন কেউ দেখেছ?" একটা দোকানদার বলে ওঠে, "হ্যাঁ, আমাদের পাড়ায় একটা আন্টি আছে, বাংলা বলে না ঠিক, কিন্তু খুব ভালো মানুষ।" এভাবে, দিনের পর দিন খোঁজ চলে। অবশেষে, চার মাস পর—সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি—তারা সেই বাসায় পৌঁছান। দরজা খুলে সাকিনা দাঁড়িয়ে, চোখে অবিশ্বাস। "আপনারা কে? আমার ছেলেরা?" তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন।
বিবিসির এই অনুসন্ধান ছিল শুধু খোঁজ নয়, এটা ছিল মানবিকতার একটা অভিযান। তারা সাকিনার সঙ্গে কথা বলেন, তাঁর গল্প রেকর্ড করেন। আসামের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ফোন করে। শেষে, একটা ভিডিও কলে মা-ছেলে-মেয়েরা কথা বলেন। সাকিনার ছেলে বলে, "মা, আমরা আপনাকে খুঁজছিলাম সারাদিন। পুলিশ বলেছিল আপনি চলে গেছেন।" এই মুহূর্তটা যেন একটা অলৌকিক মিলন—দুই দেশের মাঝখানে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটা পরিবার আবার এক হয়। বিবিসি এই গল্পটা প্রকাশ করে, যা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
পরিণতি: আদালত, আশা এবং একটা বৃদ্ধার স্বপ্ন
গল্প এখানে শেষ হয় না। বিবিসির রিপোর্ট প্রকাশের পর, বাংলাদেশ পুলিশ সক্রিয় হয়। ভাষানটেক থানা সাকিনাকে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে হেফাজত নেয়। ২৬ সেপ্টেম্বর, তাঁকে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে পাঠানো হয়। আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে সাকিনা বলেন, "আমি কোনো অপরাধ করিনি, শুধু বাড়ি ফিরতে চাই।" বিবিসির সাহায্যে ভারত-বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো যোগাযোগ করে, এবং আশা করা যাচ্ছে, শীঘ্রই তাঁকে দেশে ফেরানো হবে।
সাকিনার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সীমান্তের পেছনে মানুষের জীবন কতটা ভঙ্গুর। আসামের NRC-এর মতো নীতিগুলো কতটা মানুষকে বাস্তবে বিচ্ছিন্ন করে। কিন্তু এর মধ্যে আছে আশার আলো—একটা সাংবাদিক টিমের অধ্যবসায়, একটা দরিদ্র পরিবারের দয়া, এবং একটা বৃদ্ধার অটুট বিশ্বাস। সাকিনা এখনো বলেন, "আমি ফিরব, আমার নাতিদের কোলে বসব।" এই গল্পটা শুধু খবর নয়, এটা একটা স্মৃতি—যা আমাদের বলে, মানুষের খোঁজ চলতেই থাকবে, যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ বাড়ি পায়।