প্রাইভেট কার চালকদের শ্রমের স্বীকৃতি ও ইউনিয়নের অধিকার দিতে হবে: সাকি

প্রাইভেট কার চালকদের শ্রমের স্বীকৃতি ও ইউনিয়নের অধিকার দিতে হবে: সাকি

জোনায়েদ সাকি



সাকি

প্রাইভেট কার চালকদের শ্রমের স্বীকৃতি ও ইউনিয়নের অধিকার দিতে হবে: সাকি


ঢাকা, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫: গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি আজ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রাইভেট কার চালকদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের সংগঠিত ইউনিয়ন গঠনের অধিকার নিশ্চিত করা এখন জরুরি। তিনি বলেন, "এই দেশের মেধাস্রোতের সবচেয়ে বড় অংশ এই চালকরাই, যারা সকাল থেকে রাত অবধি রাস্তায় শ্রম দিয়ে আমাদের জীবনকে সহজ করে তোলে। কিন্তু তাদের শ্রমের কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই, কোনো নীতিমালা নেই, কোনো নিরাপত্তা নেই। এটা অসহ্য।" এই দাবি শুধু একটা স্লোগান নয়, বরং গণঅভ্যুত্থানের পর সংস্কারের একটা অংশ, যা খেটে খাওয়া মানুষের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছে।


জোনায়েদ সাকির এই বক্তব্য শুধু সাম্প্রতিক নয়, এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস। গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের কাজ শুরু হয়েছে, কিন্তু সাকি স্পষ্ট করে বলেন, "যারা শ্রম দেবে, তাদের শ্রমের স্বীকৃতি থাকতে হবে। প্রাইভেট কার চালানো একটা সুনির্দিষ্ট পেশা, কিন্তু এর জন্য কোনো সরকারি নীতিমালা নেই। চালকদের কোনো কর্মঘণ্টার নিয়ম নেই, নিয়োগপত্র নেই, ছুটির সুবিধা নেই। তারা রোজগারের জন্য রাস্তায় লড়াই করে, কিন্তু দুর্ঘটনায় মারা গেলে কোনো ক্ষতিপূরণ নেই।" এই কথাগুলো শুনে প্রেসক্লাবের সামনে উপস্থিত শতাধিক চালক সংগঠনের সদস্যরা হাততালি দিয়ে সমর্থন জানায়।


প্রাইভেট কার চালকদের দৈনন্দিন সংগ্রাম: একটা অদৃশ্য শ্রমশক্তি

প্রাইভেট কার চালকরা বাংলাদেশের শহুরে অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ঢাকার যানজটে আটকে থাকা অফিস কর্মীদের সময়মতো পৌঁছে দেওয়া, ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুল-কলেজে নিয়ে যাওয়া, ব্যবসায়ীদের মিটিংয়ের সময় রক্ষা করা—এসবের পেছনে রয়েছে তাদের অক্লান্ত শ্রম। কিন্তু এই শ্রমের মূল্যায়ন কোথায়? একজন সাধারণ চালকের দৈনিক আয় মাত্র ৮০০-১২০০ টাকা, যা থেকে জ্বালানি, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, মালিকের কমিশন কেটে যায়। ফলে, অনেকে পরিবারের খরচ চালাতে গিয়ে ঋণের জালে আটকে পড়েন।


সাকির বক্তব্য অনুসারে, এই চালকরা শিল্প শ্রমিকের মতোই অধিকারহীন। "আমরা দেখেছি, গার্মেন্টস শ্রমিকরা ইউনিয়ন গঠন করে তাদের অধিকার আদায় করে। কেন প্রাইভেট কার চালকরা পারবে না? তাদের জন্য একটা সুস্পষ্ট নীতিমালা দরকার—যাতে কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টার বেশি না হয়, সাপ্তাহিক ছুটি থাকে, স্বাস্থ্য বীমা এবং দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকে।" তিনি উদাহরণ দেন, ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশে ট্যাক্সি ড্রাইভারদের জন্য আলাদা শ্রম আইন আছে, যা তাদের ইউনিয়ন গঠনের স্বাধীনতা দেয়। বাংলাদেশে কেন এটা সম্ভব নয়?


এই সমস্যা শুধু চালকদের নয়, সমগ্র সমাজের। যখন চালকরা অতিরিক্ত পরিশ্রম করে রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্ট করে ফেলেন, তখন শুধু তাদের পরিবার নয়, যাত্রীদেরও ক্ষতি হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার রাস্তা দুর্ঘটনায় ৩-৪ হাজার মানুষ মারা যায়, যার একটা বড় অংশ চালকদের অবস্থা-সংক্রান্ত। সাকি বলেন, "এই শ্রমের স্বীকৃতি না দিলে, আমরা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাব। মুক্তিযুদ্ধে লাখো মানুষ প্রাণ দিয়েছে নাগরিকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য, কিন্তু গত ৫৪ বছরে সেটা হয়নি। ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসানের পর এখন সময় সংস্কারের।"


ইউনিয়নের অধিকার: শ্রমিক সংহতির চাবিকাঠি

জোনায়েদ সাকির দাবির মূলে রয়েছে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুসারে, শ্রমিকরা ইউনিয়ন গঠন করতে পারে, কিন্তু প্রাইভেট কার চালকদের ক্ষেত্রে এটা প্রায় অসম্ভব। কেন? কারণ তারা 'শিল্প প্রতিষ্ঠানের' অংশ বলে বিবেচিত হয় না। সাকি বলেন, "ইউনিয়ন করার অধিকার না দিলে, চালকরা একা একা লড়াই করবে। কিন্তু সংগঠিত হলে তারা মজুরি বাড়ানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—সবকিছু দাবি করতে পারবে।" তিনি উল্লেখ করেন, গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারকে চিঠি লিখে এই দাবি জানানো হয়েছে। শ্রম সংস্কার কমিশনে এটা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।


এই অধিকারের পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এর নির্দেশিকা। ILO কনভেনশন ৮৭ অনুসারে, সব শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার আছে, যা বাংলাদেশ অনুমোদন করেছে। কিন্তু বাস্তবে, প্রাইভেট সেক্টরের অনেক পেশায় এটা প্রয়োগ হয় না। সাকির মতে, এখন গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই মুহূর্তে, যখন নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে, তখন এই সংস্কার না করলে খেটে খাওয়া মানুষের উপর আবারও অবিচার হবে। "ভূমিহীন কৃষক ভূমি পায়নি, শ্রমিকের মজুরি বাড়েনি—এই চক্র ভাঙতে হবে। প্রাইভেট কার চালকরা এর অগ্রদূত হতে পারে।"


চালকদের কণ্ঠ: বাস্তব গল্প থেকে উঠে আসা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত একজন চালক, রহিম উদ্দিন, বলেন, "আমি ১৫ বছর ধরে গাড়ি চালাই। সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ডিউটি, কিন্তু কোনো ছুটি নেই। একবার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, হাসপাতালের খরচ নিজে দিয়েছি। ইউনিয়ন থাকলে এটা ঘটত না।" আরেকজন, ফাতেমা বেগম, যিনি মহিলা চালক হিসেবে কাজ করেন, বলেন, "আমরা মহিলাদের জন্য আলাদা সুবিধা চাই—নিরাপদ পার্কিং, হ্যারাসমেন্ট প্রতিরোধ। সাকি ভাইয়ের কথা আমাদের আশা দিয়েছে।"


এই গল্পগুলো শুধু ব্যক্তিগত নয়, এর পেছনে রয়েছে হাজারো পরিবারের সংগ্রাম। সাকি বলেন, "এই চালকরা যদি সংগঠিত হয়, তাহলে তারা শুধু নিজেদের জন্য নয়, সমগ্র পরিবহন খাতের সংস্কার আনতে পারবে। রাইড-শেয়ারিং অ্যাপের যুগে তো এটা আরও জরুরি।"


সংস্কারের পথ: সরকারের দায়িত্ব এবং আন্দোলনের ভূমিকা

জোনায়েদ সাকি তার বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারকে আহ্বান জানান, "নতুন শ্রম আইন তৈরিতে প্রাইভেট কার চালকদের অন্তর্ভুক্ত করুন। ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন সহজ করুন, ধর্মঘটের অধিকার দিন।" তিনি উল্লেখ করেন, শ্রম আইনে ধর্মঘটের জন্য ৫১% সদস্যের সম্মতি লাগে, কিন্তু প্রথমে ইউনিয়ন গঠনের অধিকার দিতে হবে। গণসংহতি আন্দোলন এই বিষয়ে একটা জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু করবে, যাতে চালক সংগঠনগুলোকে একত্রিত করা যায়।


এই দাবি শুধু প্রাইভেট কার চালকদের নয়, সব অদৃশ্য শ্রমিকের—যেমন ডেলিভারি রাইডার, ফ্রিল্যান্সার—প্রতিনিধিত্ব করে। সাকি বলেন, "গণঅভ্যুত্থানের ফল হলো বিচার, সংস্কার এবং নির্বাচন। এই সংস্কারে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ না থাকলে সেটা অসম্পূর্ণ।" দেশের রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে, যখন উগ্রপন্থী শক্তির উত্থানের আশঙ্কা রয়েছে, তখন এই মতামতের মীমাংসা নির্বাচনের মাধ্যমে হোক—কিন্তু তার আগে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করুন।


মর্যাদার লড়াই, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি

জোনায়েদ সাকির এই দাবি বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। প্রাইভেট কার চালকরা, যারা রাস্তার যোদ্ধা, তাদের শ্রমের স্বীকৃতি এবং ইউনিয়নের অধিকার না দিলে, খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এটা শুধু আইনি লড়াই নয়, মানবিক লড়াই। গণসংহতি আন্দোলনের এই উদ্যোগ যেন সফল হয়, যাতে প্রতিটি চালকের মুখে হাসি ফুটে ওঠে এবং তাদের শ্রম হয় মর্যাদার। এই লড়াই চলবে, যতক্ষণ না শ্রমিকের অধিকার হয় স্বীকৃত।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন