জনপ্রিয় ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী জুবিন গর্গের অকালমৃত্যু: এক অমর স্বরের বিদায়
সঙ্গীতের জগতে কখনো কখনো এমন ঘটনা ঘটে যা শুধু একজন শিল্পীর জীবনকে শেষ করে না, বরং লক্ষ লক্ষ ভক্তের হৃদয়ে একটা অতল গহ্বর তৈরি করে দেয়। ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর, সিঙ্গাপুরের সুন্দর সমুদ্রের গভীরে স্কুবা ডাইভিংয়ের সময় এক অভাবিত দুর্ঘটনায় জুবিন গর্গের জীবনের গান থেমে যায়। মাত্র ৫২ বছর বয়সে এই অমর স্বরের বিদায় ভারতের সঙ্গীতপ্রেমীদের মধ্যে এক অপূরণীয় শোকের সৃষ্টি করেছে। 'ইয়া আলি' গানের মতো হৃদয়স্পর্শী সুরের জন্য বলিউডে পরিচিত এই শিল্পী সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে উত্তর-পূর্ব ভারত উৎসবে পারফর্ম করার জন্য এসেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, সেই উৎসবের মঞ্চে তার স্বর আর ফিরে আসেনি। উৎসব আয়োজকদের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "ডুবের সময় শ্বাসকষ্ট হওয়ায় তাকে তাৎক্ষণিক সিপিআর দেওয়া হয় এবং সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। তীব্র চিকিত্সা সত্ত্বেও দুপুর ২:৩০ টায় আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়।" এই সংবাদ যেন একটা কালো পর্দা টেনে দিয়েছে ভারতের সঙ্গীতের আকাশে।
জুবিন গর্গ, যার আসল নাম জুবিন বর্থাকুর, ১৯৭২ সালের ১৮ নভেম্বর মেঘালয়ের তুরায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল সঙ্গীতের ঐতিহ্যবাহী। বাবা মোহিনী বর্থাকুর ছিলেন একজন কবি এবং গীতিকার, যিনি 'কপিল থাকুর' ছদ্মনামে লিখতেন। মা ইলি বর্থাকুর ছিলেন নৃত্যশিল্পী, অভিনেত্রী এবং গায়িকা। ছোটবেলা থেকেই জুবিনের মা তার প্রথম গুরু হয়ে ওঠেন। তিন বছর বয়স থেকেই তিনি গান গাইতে শুরু করেন, এবং মায়ের কাছ থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেন। পরবর্তীকালে তিনি পণ্ডিত রবিন ব্যানার্জির কাছে তবলা শিখেন এবং গুরু রামানী রাইয়ের কাছ থেকে আসামীয় লোকসঙ্গীতের রহস্য উন্মোচন করেন। তার পরিবারের সঙ্গীতের প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, জুবিন ছোটবেলায়ই একাধিক যন্ত্র বাজাতে শিখে ফেলেন—ম্যান্ডোলিন, কীবোর্ড, গিটার, ডোতারা, ঢোল, ড্রামস, হারমোনিয়াম, টেবিলা এবং আরও অনেক। এই বহুমুখী প্রতিভা তাকে পরবর্তীকালে একজন সম্পূর্ণ সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলে।
জুবিনের জীবন ছিল সংগ্রাম এবং সাফল্যের এক অসাধারণ যাত্রা। তার বাবা আসাম সিভিল সার্ভিসের অফিসার ছিলেন, তাই পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে তার শৈশব কেটে যায়। এই অস্থিরতা তার মধ্যে একটা অভিযোজন ক্ষমতা গড়ে তোলে। ১৯৯২ সালে একটি যুব উৎসবে ওয়েস্টার্ন সোলো পারফরম্যান্সে সোনার পদক পেয়ে তিনি পেশাদার সঙ্গীত জগতে পা রাখেন। তার প্রথম আসামীয় অ্যালবাম 'অনমিকা' ১৯৯২ সালের নভেম্বরে মুক্তি পায়, যা তার ক্যারিয়ারের ভিত্তি স্থাপন করে। এরপর আসে 'জুনাকি মন' (১৯৯৩), 'মায়া' (১৯৯৪), 'আশা' (১৯৯৫) এবং আরও অনেক অ্যালবাম। ১৯৯৫ সালে তিনি মুম্বাই চলে আসেন বলিউডের স্বপ্ন দেখতে। প্রথম হিন্দি অ্যালবাম 'চাঁদনি রাত' মুক্তি পায়, এবং তারপর 'চাঁদা' (১৯৯৬), 'শ্রদ্ধাঞ্জলি' সিরিজ (১৯৯৬-৯৭), 'জলওয়া' (১৯৯৮), 'যুহি কভি' (১৯৯৮) এবং 'জাদু' (১৯৯৯) এর মতো অ্যালবামগুলো তাকে পরিচিত করে। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরে আসে ২০০৬ সালে।
'গ্যাঙ্গস্টার' চলচ্চিত্রের 'ইয়া আলি' গানটি জুবিন গর্গকে ভারতের সঙ্গীতের মানচিত্রে চিরকালের জন্য অমর করে রাখে। প্রিতম চক্রবর্তীর সুর এবং জুবিনের আত্মার স্পর্শে রচিত এই গানটি একটা ইমোশনাল ট্র্যাকবাস্টার হয়ে ওঠে। ইমরান হাশমির অভিনয়ে সজ্জিত এই গানের লিরিক্স—'ইয়া আলি রেহেম আলি, ইয়া আলি য়ার পে কুরবান হ্যায় সবহি'—যেন হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে। এই গানের জন্য তিনি ২০০৬ সালের গ্লোবাল ইন্ডিয়ান ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসে সেরা প্লেব্যাক সিঙ্গারের পুরস্কার লাভ করেন। 'ইয়া আলি' শুধু একটা গান নয়, এটা ছিল জুবিনের সংগ্রামের প্রতীক—আসাম থেকে বলিউড পর্যন্ত যাত্রার এক মাইলফলক। এরপর তিনি 'জিন্দগি' (২০০৭) অ্যালবাম মুক্তি দেন, এবং বলিউডে তার স্বর ছড়িয়ে পড়ে। 'জানে ক্যা চাহে মন' ('পার্টনার', ২০০৭), 'দিল তু হি বতা' ('ক্রিশ ৩', ২০১৩) এবং 'দিলরুবা' ('নমস্তে লন্ডন', ২০০৭) এর মতো হিট গানগুলোতে তার স্বরের জাদু কাজ করে। আক্ষয় কুমার, হৃতিক রোশন এবং ক্যাটরিনা কাইফের মতো তারকাদের সঙ্গে তার সহযোগিতা তাকে জাতীয় স্তরে তারকা করে তোলে।