বাংলার স্বপ্ন জাগিয়ে আফগানদের বিদায়: শ্রীলঙ্কার হাতে সুপার ফোরের চাবি
এশিয়া কাপ ২০২৫-এর গ্রুপ বি-এর শেষ ম্যাচটি ছিল একটি রুদ্ধশ্বাস লড়াই, যেখানে শ্রীলঙ্কা আফগানিস্তানকে ৬ উইকেটে পরাজিত করে নিজেদের সুপার ফোরে পৌঁছে দিয়েছে এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশকেও সুপার ফোরের টিকিট কেটে দিয়েছে। আবু ধাবির শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামে ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে আফগানিস্তান প্রথমে ব্যাট করে ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৬৯ রান তোলে। জবাবে শ্রীলঙ্কা ১৮.৪ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ১৭১ রান করে জয়লাভ করে। এই জয়ের ফলে আফগানিস্তান টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়, আর বাংলাদেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সুপার ফোরে প্রবেশ করে।
ম্যাচের পটভূমি এবং গুরুত্ব
এশিয়া কাপ ২০২৫ টি-২০ ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, এবং গ্রুপ বি-তে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছিল। গ্রুপের আগের ম্যাচগুলোতে শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশ উভয়েই ৪ পয়েন্ট করে অর্জন করেছিল, যখন আফগানিস্তানের ছিল ২ পয়েন্ট। এই ম্যাচে আফগানিস্তানের জয়ের উপর নির্ভর করছিল তাদের সুপার ফোরে যাওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু শ্রীলঙ্কার জয়ের ফলে নেট রান রেটের হিসাব ছাড়াই বাংলাদেশ সুপার ফোরে চলে যায়। এটি ছিল একটি 'ডু অর ডাই' ম্যাচ আফগানিস্তানের জন্য, যারা ২০২৪ টি-২০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছানোর পর থেকে অনেক আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু এখানে তারা গ্রুপ পর্যায়েই বিদায় নিল। বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা তাদের হোটেল থেকে এই ম্যাচ দেখছিলেন এবং শ্রীলঙ্কার জয়ে উল্লাস করেছেন।
### আফগানিস্তানের ইনিংস: নাবির ঝড়ো ইনিংস সত্ত্বেও সংকট
টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন আফগান অধিনায়ক রশিদ খান। শুরুটা ভালোই হয় – প্রথম দুই ওভারে ২৬ রান আসে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার পেসার নুয়ান থুশারা আঘাত হানেন। তিনি রহমানুল্লাহ গুরবাজ (১৪ রান, ৮ বল), করিম জানাত (১ রান, ৩ বল) এবং সেদিকুল্লাহ আতাল (১৮ রান, ১৪ বল) কে আউট করে আফগানিস্তানকে পাওয়ারপ্লেয়ের শেষে ৪৫/৩-এ নামিয়ে দেন। মিডল অর্ডারে ইব্রাহিম জাদরান ২৭ বলে ২৪ রান করেন, কিন্তু দারউইশ রাসুলি (৯ রান, ১৬ বল) এবং আজমতুল্লাহ ওমরজাই (৬ রান, ৪ বল) দ্রুত আউট হয়ে যান। ১২ ওভারের শেষে আফগানিস্তান ৭৯/৬-এ পড়ে।
তখন মোহাম্মদ নাবির ঝড়ো ইনিংস শুরু হয়। তিনি ২২ বলে ৬০ রান করেন, যার মধ্যে ৩ চার এবং ৬ ছক্কা। বিশেষ করে শেষ ওভারে দুনিথ ওয়েলালাগের বিরুদ্ধে ৫টি ছক্কা মেরে ৩২ রান তোলেন, যা এশিয়া কাপের ইতিহাসে দ্রুততম ফিফটির সমান (১৭ বলে)। রশিদ খান ২৩ বলে ২৪ রান করে সহায়তা করেন। শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তান ১৬৯/৮ তোলে। থুশারা ৪ উইকেট নেন (৪ ওভারে ১৮ রান), যখন দুশমন্ত চামিরা এবং দাসুন শানাকা ১টি করে উইকেট পান। নাবির এই ইনিংস ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত ছিল, যা আফগানিস্তানকে একটি প্রতিযোগিতামূলক স্কোর দিয়েছে।
শ্রীলঙ্কার চেজ: কুসল মেন্ডিসের অসাধারণ ইনিংস
১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শ্রীলঙ্কা শুরুতে ধাক্কা খায়। পাথুম নিসাঙ্কা ৫ বলে ৬ রান করে আউট হন, এবং কামিল মিশারা ৪ রান করেন। কিন্তু কুসল মেন্ডিস অসাধারণভাবে ইনিংস গড়েন – ৫২ বলে অপরাজিত ৭৪ রান, ১০টি চার সহ। তাঁর সঙ্গে কুসল পেরেরা, চারিথ আসালাঙ্কা এবং কামিন্দু মেন্ডিস (১৩ বলে ২৬ রান) সহায়তা করেন। আফগান বোলাররা চাপ তৈরি করতে পারেনি – রশিদ খান, ফজলহক ফারুকি, মুজিব উর রহমান এবং নুর আহমদ উইকেট নিলেও রান আটকাতে ব্যর্থ হন। শ্রীলঙ্কা ৮ বল বাকি থাকতেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। মেন্ডিসকে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় ঘোষণা করা হয়।
খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ
- **মোহাম্মদ নাবি (আফগানিস্তান):** ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা। ২২ বলে ৬০ রানের পাশাপাশি বোলিংয়েও অবদান রাখেন। তাঁর শেষ ওভারের ৫ ছক্কা ইতিহাসে লেখা থাকবে।
কুসল মেন্ডিস (শ্রীলঙ্কা): অ্যাঙ্কর রোল পালন করে দলকে জিতিয়েছেন। ৭৪* রানের ইনিংসে ১০ চার, যা চেজকে সহজ করে তোলে।
নুয়ান থুশারা (শ্রীলঙ্কা): ৪ উইকেট নিয়ে আফগান টপ অর্ডার ধ্বংস করেন। তাঁর ইকোনমি ৪.৫০ ছিল।
রশিদ খান (আফগানিস্তান)অধিনায়ক হিসেবে ২৪ রান করেন এবং বোলিংয়ে চাপ তৈরি করেন, কিন্তু দলের পরাজয় আটকাতে পারেননি।
আফগানিস্তানের ফিল্ডিংও ছিল দুর্বল, যখন শ্রীলঙ্কার ক্যাচিং এবং রানআউট (নাবির) ছিল চমৎকার।
বাংলাদেশের জন্য অর্থ এবং ভবিষ্যৎ
এই ম্যাচের ফলাফল বাংলাদেশের জন্য ছিল সোনার চাঁদ। তারা গ্রুপে শ্রীলঙ্কার কাছে হারলেও আফগানিস্তানকে হারিয়েছিল, এবং এখন সুপার ফোরে ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার সঙ্গে লড়াই করবে। বাংলাদেশের অধিনায়ক (যিনি ম্যাচ না খেললেও) এই জয়কে 'উপহার' বলে বর্ণনা করেছেন। আফগানিস্তানের জন্য এটি একটি ধাক্কা – ২০২৩ ওডিআই বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ টি-২০ বিশ্বকাপের সাফল্যের পর তারা গ্রুপ স্টেজে বিদায় নেয়। তাদের মিডল অর্ডার এবং বোলিংয়ে উন্নতি দরকার।
সুপার ফোরে এখন গ্রুপ এ থেকে ভারত এবং পাকিস্তান, গ্রুপ বি থেকে শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশ। এটি হবে একটি তীব্র লড়াই। শ্রীলঙ্কার এই জয় দেখিয়েছে যে তারা চ্যাম্পিয়নশিপের দাবিদার। বাংলাদেশের জন্য এটি নতুন সুযোগ – তারা কি এবার ট্রফি জিততে পারবে? সময় বলবে।
এই ম্যাচটি ক্রিকেটের অপ্রত্যাশিততা দেখিয়েছে – যেখানে একটি দলের জয় অন্য দলের ভাগ্য বদলে দেয়। শ্রীলঙ্কা আফগানদের বিদায় দিয়ে বাংলাদেশকে সুপার ফোরে তুলেছে, এবং এটি এশিয়া কাপের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।