হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী চলছে মধ্যপ্রাচ্যের খেলা?
যুদ্ধবিরতি কিন্তু আগুন নেভেনি! ‘আঙুল এখনও ট্রিগারে’ – মোজতবা খামেনির কড়া বার্তায় কাঁপছে বিশ্ব, হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী চলছে মধ্যপ্রাচ্যের খেলা?
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, একটা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা কীভাবে শান্তির বদলে আরও বড় উত্তেজনা তৈরি করতে পারে? ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল, বিশ্বের দৃষ্টি আটকে গেছে ইরানের দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পরও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন – এটা যুদ্ধের সমাপ্তি নয়। তাঁর ভাষায়, “আমাদের আঙুল এখনও ট্রিগারেই আছে।” এই একটি বাক্যই পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে ঝাঁকুনি দিয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই সিদ্ধান্ত এলেও, হরমুজ প্রণালীর নিরাপদ চলাচল নিয়ে শর্তসাপেক্ষ এই যুদ্ধবিরতি বিশ্ব অর্থনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করবে? আসুন, বিস্তারিত জেনে নিই এই জটিল খেলার পুরো গল্পটা।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি-তে প্রচারিত এক বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন দেশের সব সামরিক ইউনিটকে। তিনি বলেছেন, যুদ্ধবিরতি মানে যুদ্ধ শেষ নয়। সব সামরিক শাখাকে গুলি চালানো বন্ধ রাখতে হবে, কিন্তু শত্রুপক্ষ – যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েল – যদি সামান্যতম ভুল করে, তাহলে পূর্ণ শক্তিতে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতিতেও একই সুর: “এটি যুদ্ধের সমাপ্তি নির্দেশ করে না… আমাদের আঙুল এখনো ট্রিগারের ওপর আছে।” এই কড়া ভাষা দেখে স্পষ্ট হয়ে যায়, ইরান কোনোভাবেই দুর্বলতা দেখাতে চায় না। বরং এটা একটা কৌশলগত বিরতি, যাতে তারা নিজেদের শক্তি পুনর্গঠন করতে পারে।
pbs.org
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আগেই ঘোষণা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা বন্ধ করে তাহলে ইরান যুদ্ধবিরতিতে রাজি। আর এই যুদ্ধবিরতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত – হরমুজ প্রণালী দিয়ে দুই সপ্তাহের জন্য নিরাপদ জাহাজ চলাচল। আরাঘচি বলেছেন, “ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে এটা বাস্তবায়ন করা হবে।” হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? বিশ্বের তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু প্রণালী দিয়ে যায়। ইরান যদি এটা বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যাবে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত – সবার তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে। এই প্রণালী বন্ধ হলে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে শুরু করে এশিয়ার বাজার সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে জানিয়েছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের ‘বিশেষ অনুরোধে’ তিনি ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত ‘বিধ্বংসী হামলা’ দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছেন। ট্রাম্প লিখেছেন, “এটা একটা উভয়মুখী যুদ্ধবিরতি। কিন্তু প্রধান শর্ত হলো, ইরানকে অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে খুলে দিতে হবে।” তিনি আরও দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাদের সামরিক লক্ষ্য পূরণ করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির দিকে এগোচ্ছে।
cbc.ca
পাকিস্তানের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেহবাজ শরিফ এবং জেনারেল আসিম মুনিরের অনুরোধ ছাড়া হয়তো এই যুদ্ধবিরতি আসতই না। পাকিস্তান ইরানের প্রতিবেশী এবং ঐতিহাসিকভাবে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলে শান্তি বজায় রাখা পাকিস্তানের নিজস্ব স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। কারণ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে পাকিস্তানের সীমান্তও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। শেহবাজ শরিফের এই কূটনৈতিক সাফল্য বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের অবস্থানকে আরও মজবুত করেছে।
এই যুদ্ধবিরতির পেছনে লুকিয়ে আছে অনেক গভীর কারণ। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ। ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত, নিউক্লিয়ার ইস্যু, তেলের রপ্তানি – সবকিছুই এখানে জড়িত। মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান এখন আরও শক্ত অবস্থান নিয়েছে। তাঁর বার্তা শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তিকে একত্রিত করছে না, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে দিচ্ছে যে ইরান কোনো চাপের কাছে মাথা নত করবে না।
হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক গুরুত্ব নিয়ে আরও বিস্তারিত বলা যাক। এই প্রণালী পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল এখান দিয়ে যায়। ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই এলাকায় কোনো অস্থিরতা হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কায় তেলের দাম বেড়েছে। এই যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তি দিলেও, দুই সপ্তাহ পর কী হবে? ইরান কি শর্ত মেনে প্রণালী খুলে দেবে? নাকি আরও জটিলতা তৈরি হবে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধবিরতি একটা ‘ট্যাকটিক্যাল পজ’। ইরান চায় নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও মজবুত করতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও চায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পথ খুলতে। কিন্তু মোজতবা খামেনির “আঙুল ট্রিগারে” বার্তা দেখিয়ে দিচ্ছে যে শান্তি আসলেই আসেনি, শুধু বিরতি এসেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এখনও পুরোপুরি সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
এই ঘটনার প্রভাব বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায়ও পড়বে। আমাদের দেশ তেল আমদানি করে। তেলের দাম বাড়লে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে, যা অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় মুসলিম বিশ্বের ঐক্যেরও একটা বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় – দুই সপ্তাহ পর কী হবে? যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চায়, নাকি এটা শুধু একটা কৌশল?
আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, এই সংঘাতের শেকড় অনেক পুরনো। ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক তিক্ত। নিউক্লিয়ার চুক্তি ভাঙা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ড্রোন হামলা – সবকিছু মিলিয়ে একটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান এখন আরও আধুনিক সামরিক শক্তি গড়ে তুলেছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, ড্রোন বাহিনী এবং সাইবার ক্ষমতা বিশ্বকে চিন্তিত করে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রশাসন চায় মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে। হরমুজ খুলে দেওয়ার শর্তটা তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা শুধু তেল নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তারও প্রশ্ন। যদি ইরান শর্ত না মানে, তাহলে যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানের মতো দেশের মধ্যস্থতায় হয়তো আরও আলোচনার পথ খুলবে।
এই ঘটনা বিশ্ব রাজনীতির নতুন মোড়। চীন, রাশিয়া – যারা ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ – তারাও এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু তারা চায় ইরানের স্বার্থ রক্ষা হোক। ইউরোপীয় দেশগুলো তেলের দাম নিয়ে চিন্তিত। সব মিলিয়ে এটা একটা বড় কূটনৈতিক খেলা।
শেষ কথা, মোজতবা খামেনির বার্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যুদ্ধবিরতি মানে শান্তি নয়, শুধু একটা সাময়িক বিরতি। “আঙুল ট্রিগারে” রেখেই ইরান অপেক্ষা করছে। বিশ্ব এখন দেখবে, এই দুই সপ্তাহ কীভাবে কাটে। হরমুজ প্রণালী খুলবে কি না, নাকি নতুন সংঘাতের বীজ বপন হবে? এটা শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও শান্তির প্রশ্ন।
এই ঘটনা আমাদের শেখায়, কূটনীতি কখনো সোজা পথে চলে না। পাকিস্তানের মতো দেশের ভূমিকা দেখিয়ে দেয় যে ছোট দেশগুলোও বড় খেলায় প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটা একটা শিক্ষা – আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। তেলের দাম বাড়লে আমাদের জীবনযাত্রার খরচ বাড়বে, শিল্প উৎপাদন কমবে। তাই বিশ্বের এই জটিল খেলা আমাদের সবাইকে প্রভাবিত করছে।
আরও একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই যুদ্ধবিরতি নেতৃত্বের শক্তি বাড়িয়েছে। মোজতবা খামেনির সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দিয়েছে যে তিনি শুধু নেতা নন, একজন কৌশলবিদও। অন্যদিকে ট্রাম্পও নিজেকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। দুই সপ্তাহ পর যদি কোনো পক্ষ শর্ত ভঙ্গ করে, তাহলে পুরো অঞ্চল আবার আগুনে পুড়বে।
এই লেখায় আমরা দেখলাম কীভাবে একটা যুদ্ধবিরতি পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিতে পারে। হরমুজ প্রণালী, তেল, কূটনীতি, সামরিক শক্তি – সবকিছু মিলে একটা বড় ছবি। মোজতবা খামেনির “আঙুল ট্রিগারে” বার্তা শুধু একটা সতর্কবার্তা নয়, এটা একটা রণকৌশল। বিশ্ব এখন অপেক্ষায় – দুই সপ্তাহ কী নিয়ে আসে? শান্তি না আরও বড় যুদ্ধ?