সোনার দামে আগুন! ৫ হাজার ডলার ছাড়াল বিশ্ববাজার—বাংলাদেশে এখন ভরি কত টাকা? শকিং আপডেট
স্বর্ণের দামের এই অভূতপূর্ব উত্থান-পতন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে বোঝা যায়, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতি কতটা জটিল এবং অনিশ্চয়তায় ভরা। বিবিসি বাংলার একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন (৩১ জানুয়ারি ২০২৬) থেকে জানা যায়, স্বর্ণের দাম বিশ্ববাজারে প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে, এমনকি সাময়িকভাবে ৫ হাজার ৫০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। বাংলাদেশে তো অবস্থা আরও চরম—গত বৃহস্পতিবার এক ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) সোনার দাম ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় উঠেছিল। কিন্তু মাত্র দুই-তিন দিনের মধ্যেই দাম প্রায় ৩০ হাজার টাকা কমে এসেছে। এই ওঠানামা কেন ঘটছে? কী কী কারণে স্বর্ণ এতটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে বিনিয়োগকারীদের কাছে? আসুন বিস্তারিতভাবে দেখি।
স্বর্ণ কেন 'নিরাপদ আশ্রয়' হিসেবে বিবেচিত হয়?
স্বর্ণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের কাছে শুধু অলংকার নয়, বরং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় 'সেফ হেভেন' বা নিরাপদ আশ্রয়। যখন শেয়ারবাজার পড়ে যায়, মুদ্রার মান কমে, যুদ্ধ-অশান্তি বাড়ে—তখনই মানুষ স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটি কোনো কোম্পানির শেয়ার নয় যে দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে, কোনো সরকারি বন্ড নয় যার মান রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ওঠানামা করে। স্বর্ণের নিজস্ব মূল্য আছে—এটি শারীরিকভাবে ধাতু, সীমিত পরিমাণে পাওয়া যায় এবং হাজার বছর ধরে মানুষ এটিকে মূল্যবান মনে করে এসেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বৈশিষ্ট্যগুলো আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
স্বর্ণের দাম রেকর্ড ছোঁয়ার তিনটি প্রধান কারণ:
১.ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি ও শুল্কের হুমকি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন মেয়াদে বাণিজ্যনীতি আবারও আলোচনায়। যেসব দেশকে তিনি 'অনুকূল' মনে করেন না, তাদের পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের ঘোষণা এসেছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ, চীন, কানাডাসহ অনেকের ওপর নতুন শুল্কের হুমকি। এমনকি গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে তার অধিগ্রহণের পরিকল্পনা ও হুমকি বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। এসবের ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা ভয় পাচ্ছেন—যদি বড় বড় অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে শেয়ারবাজার ধসে পড়বে, ডলারের মান অস্থির হবে। ফলে তারা স্বর্ণে টাকা ঢালছেন। হারগ্রিভস ল্যান্সডাউনের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ এমা ওয়াল বলেছেন, এই নীতিগুলো বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে এবং স্বর্ণের দামের লাফালাফিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
২.চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এখনো চলছে, গাজায় সংঘাত অব্যাহত। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের আটক করার মতো ঘটনাও হয়েছে। এসব যুদ্ধ ও উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। ডলারের প্রতি আস্থা কমছে অনেক দেশের। ফলে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছে বিনিয়োগকারীরা। এমা ওয়ালের ভাষায়, “দুনিয়া যখন অস্থির হয়ে ওঠে, স্বর্ণ তখন তার স্বভাবসুলভ কাজটাই করে—বাণিজ্যিক উত্তেজনা, ভূরাজনৈতিক ফাটল এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে লাফিয়ে দাম বাড়ায়।”
৩. কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক স্বর্ণ কেনা
এটি একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বিশেষ করে চীন, রাশিয়া, ভারতসহ) বছরের পর বছর ধরে তাদের রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণ বাড়াচ্ছে। কারণ? তারা ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কারণে যদি ডলার দুর্বল হয় বা নিষেধাজ্ঞা আসে, তাহলে স্বর্ণই তাদের সুরক্ষা দেয়। এমা ওয়াল বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণকেই রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রাধান্য দিচ্ছে। এই বিপুল কেনাকাটা সরাসরি দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু দাম কমল কেন?
সবকিছু শুধু বাড়তেই থাকে না। গত বৃহস্পতিবারের পর শুক্র ও শনিবার বাংলাদেশে ভরিপ্রতি প্রায় ৩০ হাজার টাকা কমেছে। কারণ? যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কিছু ইঙ্গিত মিলেছে। ট্রাম্পের কিছু নীতি নিয়ে আলোচনা-সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক কিছুটা কমেছে। তারা কিছু স্বর্ণ বিক্রি করে দিয়েছেন। এছাড়া স্বর্ণের দাম খুব দ্রুত বাড়লে অনেকে লাভ তুলে নিতে চান। ফলে সাময়িকভাবে দাম কমে।
তবে এখনো দাম গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি উঁচুতে আছে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের প্রতি আকর্ষণ কমেনি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কী বোঝায়?
বাংলাদেশে স্বর্ণ শুধু বিনিয়োগ নয়, বিয়ের অলংকার, পারিবারিক সম্পদের একটা বড় অংশ। দাম বাড়লে বিয়ের খরচ বেড়ে যায়, পরিবারগুলো চাপে পড়ে। আবার দাম কমলে অনেকে কিনতে চান। কিন্তু এই ওঠানামা সাধারণ মানুষের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় স্বর্ণ কেনা ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে (৫-১০ বছর) এটি ভালো রক্ষাকবচ হতে পারে।
স্বর্ণের এই গল্প শুধু ধাতুর দামের গল্প নয়—এটি বিশ্ব রাজনীতি, যুদ্ধ, বাণিজ্যযুদ্ধ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৌশল—সবকিছুর প্রতিফলন। ট্রাম্পের নীতি, গ্রিনল্যান্ড ইস্যু, ইউক্রেন-গাজা সংঘাত—এসব কিছু মিলে স্বর্ণকে আবারও 'রাজা' বানিয়েছে। কিন্তু যেকোনো সময় পরিস্থিতি বদলালে দামও বদলাবে। তাই স্বর্ণ কেনা-বেচার আগে ভালো করে বুঝে নেওয়া দরকার—এটি কোনো জাদুর কাঠি নয়, বরং বিশ্বের অস্থিরতার একটা আয়না।
আপনার এলাকায় স্বর্ণের দাম এখন কত? কিংবা এই ওঠানামায় আপনি কী ভাবছেন? মন্তব্যে জানান!