এই ১৮ মাসে বাংলাদেশ কি সত্যিই এগিয়েছে, নাকি নতুন করে পিছিয়ে পড়েছে?

এই ১৮ মাসে বাংলাদেশ কি সত্যিই এগিয়েছে, নাকি নতুন করে পিছিয়ে পড়েছে?
এই ১৮ মাসে বাংলাদেশ কি সত্যিই এগিয়েছে, নাকি নতুন করে পিছিয়ে পড়েছে?( Image from facebook)


এই ১৮ মাসে বাংলাদেশ কি সত্যিই এগিয়েছে, নাকি নতুন করে পিছিয়ে পড়েছে?

 বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের আগস্ট মাস একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের সরকারের পতনের পর দেশে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা পূরণ করতে এগিয়ে এসেছিলেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ৮ আগস্ট ২০২৪-এ তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। এই সরকারের সামনে ছিল তিনটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ—দেশে সংস্কার প্রক্রিয়া চালু করা, জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এই অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৮ মাস ক্ষমতায় ছিল। এই সময়ে তারা কী অর্জন করেছে এবং কোথায় পিছিয়ে পড়েছে—এ নিয়ে আজ সমাজের সর্বস্তরে তীব্র আলোচনা চলছে। আসুন বিস্তারিতভাবে দেখি এই সরকারের যাত্রাপথ। সাফল্যের দিকগুলো যা অনস্বীকার্য প্রথমত, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই সরকার উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। যখন তারা দায়িত্ব নেয়, তখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল মাত্র ১৪ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসে সেই রিজার্ভ দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে ২৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং শ্বেতপত্র প্রকাশের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বাড়ানো হয়েছে। আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেছে। দ্বিতীয়ত, সংস্কারের প্রক্রিয়া। সরকার ১১টি কমিশন গঠন করে এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাত থেকে সরিয়ে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কারের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় হয়। এটি একটি বড় অর্জন, কারণ এর মাধ্যমে সংস্কারের পথ সুগম হয়েছে। তৃতীয়ত, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার। জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার ঘটনাবলির বিচারে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। ৮৩৭টি মামলা দায়ের হয়েছে, যার মধ্যে ৪৫টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডাদেশ (১৭ নভেম্বর ২০২৫)। এই বিচার প্রক্রিয়া অনেকের কাছে প্রতিশোধমূলক মনে হলেও, সরকারের দাবি ছিল এটি রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে করা হয়েছে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার ফলে শুল্ক হ্রাস (২০% থেকে ১৯%), গম আমদানি (৩৫ লাখ টন) এবং অন্যান্য সুবিধা পাওয়া গেছে। এছাড়া অন্যান্য দেশের সাথে যুদ্ধবিমান-হেলিকপ্টার ক্রয়ের চুক্তিও হয়েছে। ব্যর্থতা ও সমালোচনার দিকগুলো কিন্তু সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতাও কম নয়। সবচেয়ে বড় সমালোচনা এসেছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব সন্ত্রাসের ঘটনা বেড়েছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ভবনে হামলা, ৪০টি মাজারে ৪৪ বার আক্রমণ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা (দিপু চন্দ্র হত্যা, হিন্দু ব্যবসায়ী খুন), নারীদের প্রতি হেনস্তা—এসব ঘটনা সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতার প্রমাণ দিয়েছে। অধিকার সংস্থার মতে, বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা ৪০-এরও বেশি। হেফাজতে মৃত্যু এবং অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের ঘটনা বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, সংখ্যালঘু ও নারী নিরাপত্তা। সরকার সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নারী সমতার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়া লক্ষ্য করা গেছে। তৃতীয়ত, সংস্কার প্রক্রিয়ায় অ্যাডহক পদ্ধতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে পর্যাপ্ত আলোচনার অভাব। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সরকার স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভালো করলেও সামাজিক ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হয়েছে। চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিতর্ক। নির্বাচনের ঠিক দু'দিন আগে চুক্তি স্বাক্ষর এবং বিষয়বস্তু প্রকাশ না করায় সমালোচনা হয়েছে। শেষ কথা অধ্যাপক ইউনূসের বিদায়ী ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “আমাদের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি ছিল না। আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনীতি ও প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রেখেছি।” কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই সরকার কিছু ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সাফল্য এনেছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে গভীর ব্যর্থতার দাগ রেখে গেছে। এখন নতুন নির্বাচিত সরকারের হাতে দেশ। তারা কীভাবে এই সাফল্য ধরে রাখবে এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়। বাংলাদেশের এই অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যায় আমাদের শিখিয়েছে যে, পরিবর্তন আনা সহজ নয়, তাকে টেকসই করা আরও কঠিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন