গাজা সংকটে নতুন মোড়: হামাসের মুক্তির প্রতিশ্রুতি, ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা এবং ইসরায়েলের সামরিক সংযম

গাজা সংকটে নতুন মোড়
 গাজা সংকটে নতুন মোড়

 গাজা সংকটে নতুন মোড়: হামাসের মুক্তির প্রতিশ্রুতি, ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা এবং ইসরায়েলের সামরিক সংযম

২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর, শনিবার—মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক আকাশে হঠাৎ এক উজ্জ্বল আলোর রেখা দেখা দিয়েছে। প্রায় দু'বছর ধরে চলমান গাজা সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে হামাসের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে। হামাস জানিয়েছে, তারা সকল ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার জন্য রাজি, কিন্তু পরিকল্পনার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও আলোচনা চায়। এর ফলে ট্রাম্প ইসরায়েলকে গাজায় বোমাবর্ষণ অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে জিম্মিদের নিরাপদ মুক্তি সম্ভব হয়। ওদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে শুধুমাত্র প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে সীমাবদ্ধ রাখার নতুন নির্দেশ জারি হয়েছে, এবং গাজা সিটির 'দখল' তৎপরতা স্থগিত করা হয়েছে। এই ঘটনাপ্রবাহ মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির একটি আশার দ্বার উন্মোচন করেছে, যদিও অনেক প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত।

সংকটের পটভূমি: ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে চলা যুদ্ধের ছায়া

গাজা সংঘাতের শিকড় গভীর। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন আকস্মিক হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে, যাতে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে ৫৪,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এই যুদ্ধে গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে—হাসপাতাল, স্কুল, বাড়িঘর সবকিছু ধুলিসাৎ। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গাজায় ৭৫০,০০০-এরও বেশি মানুষ বাস্তুহারা হয়েছে, এবং খাদ্য ও পানির অভাবে মানবিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছেছে।

এই সংকটের মধ্যে ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা এসেছে যেন এক আলোকরশ্মি। সপ্তাহের শুরুতে হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এটি উন্মোচিত হয়। পরিকল্পনায় রয়েছে: তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, হামাসের পক্ষ থেকে ৪৮ জন জিম্মির মুক্তি (যার মধ্যে ২০ জন জীবিত বলে ধারণা), ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ১,৭০০ ফিলিস্তিনি বন্দী মুক্তি, হামাসের অস্ত্রসংস্থান এবং গাজার শাসন থেকে বহিষ্কার, এবং একটি 'শান্তি বোর্ড' গঠন যার নেতৃত্ব ট্রাম্প করবেন এবং যাতে প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব থাকবেন। এই বোর্ড গাজার অস্থায়ী শাসন চালাবে, যাতে কোনো ফিলিস্তিনিকে বিতাড়িত করা হবে না এবং পুনর্নির্মাণের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা আসবে।

হামাসের প্রতিক্রিয়া: মুক্তির প্রতিশ্রুতি, কিন্তু শর্তসাপেক্ষ সম্মতি

শুক্রবার সকালে হামাস তার অফিসিয়াল বিবৃতিতে জানায়, তারা ট্রাম্পের পরিকল্পনার 'বিনিময়ের সূত্র' অনুসারে সকল ইসরায়েলি জিম্মি—জীবিত এবং মৃত—মুক্তি দেওয়ার জন্য রাজি। এতে অন্তর্ভুক্ত ২০ জন জীবিত জিম্মি এবং মৃতদের দেহ। বিনিময়ে তারা ইসরায়েলের কারাগার থেকে শত শত ফিলিস্তিনি বন্দীর মুক্তি চায়। তবে, হামাস স্পষ্ট করে বলেছে যে গাজার ভবিষ্যৎ শাসন এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে আরও আলোচনা দরকার। তারা বলেছে, এগুলো 'জাতীয় কাঠামোর মধ্যে' আলোচিত হবে, যাতে হামাসসহ অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী অংশ নেবে। হামাসের এই অবস্থানে তারা অস্ত্রত্যাগ এবং গাজা শাসন থেকে বহিষ্কারের মতো ইসরায়েলের মূল দাবির সরাসরি সমর্থন করেনি।

এই বিবৃতি ট্রাম্পের চাপের পর এসেছে। শুক্রবার সকালে তিনি ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেন, "এই শেষ সুযোগের চুক্তি গ্রহণ না করলে, হামাসের বিরুদ্ধে যে নরক দেখা দেবে, তা কেউ আগে দেখেনি। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসবেই, একভাবে বা অন্যভাবে।" তিনি হামাসকে রবিবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টা (ওয়াশিংটন সময়) পর্যন্ত সময় দিয়েছিলেন। হামাসের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেন, "হামাসের বিবৃতির ভিত্তিতে আমি বিশ্বাস করি তারা স্থায়ী শান্তির জন্য প্রস্তুত। ইসরায়েলকে গাজায় বোমাবর্ষণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে, যাতে জিম্মিরা নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারে। আমরা ইতিমধ্যে বিস্তারিত আলোচনায় রয়েছি।"

ইসরায়েলের পদক্ষেপ: প্রতিরক্ষামূলক অভিযান এবং গাজা সিটির দখল স্থগিত

হামাসের বিবৃতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেনাবাহিনীকে নতুন নির্দেশ জারি করে। আর্মি রেডিও এবং কান পাবলিক ব্রডকাস্টারের তথ্য অনুসারে, আইডিএফ (ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস) গাজায় শুধুমাত্র প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকবে। গাজা সিটির 'দখল' অভিযান স্থগিত করা হয়েছে, এবং সামগ্রিক কার্যক্রম 'সর্বনিম্ন' স্তরে নামানো হয়েছে। নেতানিয়াহুর অফিস জানিয়েছে, "হামাসের প্রতিক্রিয়ার আলোকে ইসরায়েল ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়—সকল জিম্মির অবিলম্ব মুক্তি—বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত।"

এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের চাপ এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের নাইট টকসের ফল। নেতানিয়াহু বলেছেন, "আমরা প্রেসিডেন্ট এবং তার টিমের সাথে সমন্বয় করে যুদ্ধ শেষ করব, যা ইসরায়েলের নীতি এবং ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।" তবে, শনিবার সকালে গাজা সিটিতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় ৬ জন নিহত হয়েছে বলে খবর আসে, যা বোমাবর্ষণের তীব্রতা কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এটি দেখায় যে শান্তির পথে এখনও বাধা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: সমর্থন এবং সতর্কতা

ট্রাম্পের পরিকল্পনা আন্তর্জাতিকভাবে স্বাগত জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, "সকল পক্ষকে এই সুযোগ গ্রহণ করতে হবে যাতে গাজার দুঃখজনক সংঘাত শেষ হয়।" যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার বলেছেন, "হামাসের সম্মতি একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ, এটি অবিলম্ব বাস্তবায়ন করতে হবে।" ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ টুইটারে লিখেছেন, "সকল জিম্মির মুক্তি এবং গাজায় যুদ্ধবিরতি এখন সম্ভব!" জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ বলেছেন, "দু'বছর পর এটি শান্তির সেরা সুযোগ।"

আরব বিশ্বেও সমর্থন এসেছে। কাতার, মিশর এবং জর্ডানের মতো দেশগুলো মধ্যস্থতায় সক্রিয়। পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং মিশরের ভূমিকাকে ট্রাম্প ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ট্রাম্পের নেতৃত্বকে প্রশংসা করেছেন। তবে, প্যালেস্টাইন অথরিটি (ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের শাসক) বলেছে যে পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্বের জন্য আরও সংস্কার দরকার।

চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ: শান্তির পথ কতটা সহজ?

যদিও এই উন্নয়ন আশাবাদী, চ্যালেঞ্জ অনেক। হামাসের মধ্যে রাজনৈতিক এবং সামরিক ডানার মধ্যে মতভেদ রয়েছে—রাজনৈতিক অংশ সমঝোতায় রাজি, কিন্তু সামরিক অংশ অস্ত্র ত্যাগ মানতে চায় না। ইসরায়েলের পক্ষে নেতানিয়াহুর কোয়ালিশনের চাপ রয়েছে, যারা হামাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল চায়। গাজায় সাহায্যের অভাব এবং পুনর্নির্মাণের খরচ (যা ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে) আরও জটিলতা সৃষ্টি করছে।

জাতিসংঘের মতে, এই পরিকল্পনা সফল হলে গাজায় ২০ লক্ষ মানুষের জীবন বদলে যাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, দীর্ঘমেয়াদী শান্তির জন্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নও উত্থাপিত হতে হবে। ১৯৬৭ সালের সীমান্ত এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের দাবি এখনও জোরালো।

: আশার আলো, কিন্তু সতর্কতা জরুরি

গাজা সংকটে এই মোড় মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। হামাসের মুক্তির প্রতিশ্রুতি, ট্রাম্পের কূটনৈতিক চাপ এবং ইসরায়েলের সামরিক সংযম যেন একসাথে এসে শান্তির দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু এটি স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে আসন্ন আলোচনার ফলাফলের উপর। বিশ্ব সম্প্রদায়ের চোখ এখন কায়রো এবং দোহায়—যেখানে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হতে চলেছে। ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি উভয় জনগণের জন্য এই শান্তি শুধু একটি চুক্তি নয়, একটি নতুন জীবনের সূচনা। আশা করা যাক, এবার যেন রক্তপাতের পরিবর্তে সংলাপ জয়ী হয়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন