চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: আট ঘণ্টা পেরিয়েও নিয়ন্ত্রণে আসেনি আগুন

চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: আট ঘণ্টা পেরিয়েও নিয়ন্ত্রণে আসেনি আগুন
 চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: আট ঘণ্টা পেরিয়েও নিয়ন্ত্রণে আসেনি আগুন

চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: আট ঘণ্টা পেরিয়েও নিয়ন্ত্রণে আসেনি আগুন

চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড) এলাকায় গত বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) দুপুর ২টার দিকে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অ্যাডামস ক্যাপস অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড এবং জিহং মেডিকেল কোম্পানির গুদামে লাগা এই আগুন আট ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের ২৩টি ইউনিটের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর সদস্যরা সম্মিলিতভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে আগুনের তীব্রতা এতটাই প্রবল যে, ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ভবনের কাছাকাছি যেতে পারছেন না, এবং ভেতরে থেমে থেমে বিস্ফোরণের ঘটনা আগুন নেভানোর কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের শুরু ও তীব্রতা

অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে অ্যাডামস ক্যাপস অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড এবং জিহং মেডিকেল কোম্পানির গুদামে। ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-পরিচালক জসিম উদ্দিন জানান, আগুন লাগা প্রতিষ্ঠান দুটি প্রধানত তোয়ালে এবং হাসপাতালের যন্ত্রপাতি তৈরি করত। এই কারখানাগুলোতে প্রচুর পরিমাণে দাহ্য পদার্থ মজুত ছিল, যার ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের তীব্রতা এতটাই বেড়ে গেছে যে, ভবনের আট তলার ছাদ ধসে পড়েছে। এছাড়া, ভবনের অভ্যন্তরে থেমে থেমে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে, যা উদ্ধার অভিযানকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আনোয়ার হোসেন জানান, আগুন নেভাতে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি রোবট ইউনিট, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছে। তবে প্রচণ্ড তাপের কারণে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ভবনের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না। তারা দূর থেকে পানি ছিটিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

আগুনের বিস্তার ও আশপাশের ক্ষয়ক্ষতি

আগুনের তীব্র তাপের কারণে পাশের একটি তিনতলা ভবনেও আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া, আশপাশের বেশ কয়েকটি কারখানার ভবন অতিরিক্ত গরম হয়ে গেছে, যা আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে। আগুন ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে আশপাশের কারখানাগুলোর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব উদ্যোগে তাদের ভবনে পানি ছিটিয়ে ভবনগুলো ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছে।

সিইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মো. আব্দুস সোবহান জানান, আগুনের সূত্রপাত ভবনের সপ্তম তলায়, যেটি মূলত গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই ভবনে প্রায় ৭০০ শ্রমিক কাজ করতেন। তবে সৌভাগ্যবশত, আগুন লাগার পরপরই সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। আপাতত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, যা এই দুর্যোগের মধ্যে একটি স্বস্তির বিষয়।

উদ্ধার অভিযানে সম্মিলিত প্রচেষ্টা

আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ২৩টি ইউনিট কাজ করছে, যার মধ্যে রয়েছে বন্দর, আগ্রাবাদ, ইপিজেড, কালুরঘাট ও চন্দনপুরা স্টেশনের ইউনিটগুলো। এছাড়া, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং বিজিবি’র সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করছেন। আগুনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় দুই প্লাটুন বিজিবি সদস্য ঘটনাস্থলে যোগ দিয়েছেন। আধুনিক রোবট ইউনিটের ব্যবহার এই অভিযানে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা বিপজ্জনক এলাকায় মানুষের প্রবেশ ছাড়াই পানি ছিটানোর কাজ করছে।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ উদ্বেগ

এই অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ভবনের ছাদ ধসে পড়া, থেমে থেমে বিস্ফোরণ এবং প্রচণ্ড তাপ ফায়ার সার্ভিসের কাজকে কঠিন করে তুলেছে। এছাড়া, দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি আগুনের বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করছে। আশপাশের কারখানাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই ঘটনা আরও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

এই ঘটনা শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্ব আরও একবার সামনে এনেছে। কারখানাগুলোতে দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার প্রক্রিয়ার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কঠোর নিরাপত্তা নীতিমালা এবং নিয়মিত পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়েছে।


চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের এই অগ্নিকাণ্ড শিল্পাঞ্চলের জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং বিজিবি’র সম্মিলিত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা এখনো সম্ভব হয়নি। তবে শ্রমিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং হতাহতের কোনো খবর না পাওয়া স্বস্তির বিষয়। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। আপাতত, আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকবে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন