সাতই অক্টোবরের স্মৃতি জাগ্রত ইসরায়েলে, মিশরে শান্তির সুর: দুই পক্ষের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা
দুই বছর আগের সেই কালো দিন, সাতই অক্টোবর, ইসরায়েলের ইতিহাসে চিরকালের জন্য একটা অন্ধকার অধ্যায় হয়ে আছে। ২০২৩ সালের সকালে হামাসের নেতৃত্বাধীন আক্রমণকারীদের হাতে দক্ষিণ ইসরায়েলের শান্তিপূর্ণ গ্রামগুলোতে রক্তের নদী বইতে থাকে। নোভা মিউজিক ফেস্টিভ্যালের মজাদার মেলায় নাচতে নাচতে শত শত যুবক-যুবতী হামাসের গুলিতে শহীদ হয়। কিবুৎজ নির ওয আর কফার আযার মতো ছোট্ট বসতিগুলোতে পরিবারের সদস্যরা ঘুমের মধ্যে জাগ্রত হয় অস্ত্রের শব্দে, আর তারপরই আসে অপহরণের ভয়াবহতা। প্রায় ১,২০০ নিরীহ মানুষের প্রাণহানি, ২৫১ জনকে বন্দী করে নেওয়া—এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, সেগুলো হাজার হাজার পরিবারের অশ্রুসিক্ত স্মৃতি।
আজ, ২০২৫ সালের সাতই অক্টোবর, ইসরায়েলের রাস্তায়-ঘাটে একটা গভীর নীরবতা। তেল আভিভের হোস্টেজ স্কোয়ারে মানুষেরা মোমবাতির আলোয় বসে আছে, হারানো প্রিয়জনের ছবি হাতে নিয়ে। কিবুৎজগুলোতে ছোট ছোট অনুষ্ঠানে মা-বাবারা তাদের সন্তানদের গল্প বলছেন, যারা আর ফিরবে না। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে দৃঢ়তার সুর: "আমরা হামাসের শাসনকে উচ্ছেদ করব, সব বন্দীকে ফিরিয়ে আনব, আর গাজা আর কখনো আমাদের জন্য হুমকি হবে না।" কিন্তু এই স্মরণের মাঝখানে একটা বিষাদের ছায়া—যুদ্ধ দুই বছর ধরে চলেছে, গাজায় ৬৭ হাজারেরও বেশি প্যালেস্টাইনিয়ানের প্রাণ গেছে, আর এখনও কয়েক ডজন ইসরায়েলি বন্দী হামাসের হাতে বন্দী। সমাজে ফাটল ধরেছে, সবাই জিজ্ঞাসা করছে: কবে ফিরবে শান্তি?
এই স্মৃতির দিনটাই যেন আশার একটা নতুন দরজা খুলেছে। মিশরের শর্ম এল-শেখের আকাশনীলাময় সমুদ্রতীরে, যেখানে লাল সাগরের ঢেউগুলো শান্তির গান গায়, সেখানে চলছে ইসরায়েল আর হামাসের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা। মিশর, কাতার আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিলিত প্রচেষ্টায় এই বৈঠক শুরু হয়েছে—যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে। ইসরায়েলের প্রতিনিধি রন ডারমার, হামাসের খলিল আল-হায়্যা—দুই পক্ষই বিচ্ছিন্নভাবে বসে আছে, মধ্যস্থতাকারীরা মাঝখানে। আলোচনার মূল বিষয়: বন্দীদের বিনিময়, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, গাজায় মানবিক সাহায্যের অবাধ প্রবেশ। প্রথম দিনের আলোচনা 'ইতিবাচক' বলে শোনা গেছে, আর ট্রাম্প বলেছেন, "আমরা শেষ ডিটেইলগুলো নিয়ে কাজ করছি। এটা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির একটা বড় ডিল হবে।"
কল্পনা করুন, সেই নোভা ফেস্টিভ্যালের মেয়েরা যদি আজও নাচতে পারত, বা কিবুৎজের বাচ্চারা যদি ভয় ছাড়া খেলতে পারত। গাজার শিশুরা যদি বোমার আড়ালে না লুকিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারত। এই আলোচনা সেই স্বপ্নের দিকে একটা পা ফেলেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, "সাতই অক্টোবরের ভয়াবহতা আমাদের সকলের স্মৃতিতে চিরকাল থাকবে, কিন্তু এখন শান্তির এই সুযোগকে ছাড়া যাওয়া যাবে না।" ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, "সময় যতই যাক, সেই দিনের অমানবিকতা কমে না।"
তবু, আশা করা যায় যে এই শর্ম এল-শেখের টেবিল থেকে উঠবে এমন একটা চুক্তি, যা দুই পক্ষের ক্ষত সারাবে। ইসরায়েলিরা স্মরণ করুক তাদের হারানো প্রিয়জনদের, আর প্যালেস্টাইনিরা পাক্কা শান্তির স্বপ্ন দেখুক। কারণ শান্তি শুধু কাগজের চুক্তি নয়, সেটা হাজার হাজার পরিবারের হাসির ফিরে আসা। সাতই অক্টোবর এবার শুধু দুঃখের দিন নয়, হয়তো নতুন শুরুর দিন হয়ে উঠবে।