ভোটের মাঠে আগে থেকেই ‘বহিরাগত’ ট্যাগ: রুমিন ফারহানাকে ঘায়েল করার কৌশল

  

রুমিন ফারহানাকে ঘায়েল করার কৌশল
রুমিন ফারহানাকে ঘায়েল করার কৌশল

ভোটের মাঠে আগে থেকেই ‘বহিরাগত’ ট্যাগ: রুমিন ফারহানাকে ঘায়েল করার কৌশল

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন ঘিরে দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে একটি আসনে একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী থাকলে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় উত্তেজনা, কৌশল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বাভাবিক। তবে এবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ) আসনে বিএনপির ভেতরে মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থীদের কৌশল কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে আগে থেকেই ‘বহিরাগত’ ট্যাগ দিয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করছেন স্থানীয় প্রার্থীরা।

বহিরাগত ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ প্রার্থীরা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি একজন দক্ষ আইনজীবী, সংসদে নারীর কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং দলীয় অঙ্গনে বিশেষ প্রভাবশালী। কিন্তু স্থানীয় প্রার্থীরা মনে করছেন, সরাইল ও আশুগঞ্জের ‘মাটি ও মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক নেই’ রুমিন ফারহানার। এ কারণে তাকে নির্বাচনে মনোনয়ন দিলে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে।

এই যুক্তিকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ৭ জন প্রার্থী এক হয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর আশুগঞ্জের একটি রেস্তোরাঁয় বৈঠক করেন। সেখানে তারা স্পষ্টভাবে বলেন— “স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া কাউকে এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া যাবে না।” অর্থাৎ, রুমিন ফারহানাকে বহিরাগত আখ্যা দিয়ে মনোনয়ন প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

রাজনৈতিক কৌশলের পুরোনো রীতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘বহিরাগত’ ইস্যু নতুন নয়। অতীতে অনেক আসনেই এ ধরনের অভিযোগ শোনা গেছে। সাধারণত রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতা বা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচিত ব্যক্তিরা যখন কোনো জেলায় মনোনয়ন চান, তখন স্থানীয়রা তাদেরকে বাইরে থেকে আসা প্রার্থী হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কারণ স্থানীয় রাজনীতিবিদরা মনে করেন, বছরের পর বছর জনগণের পাশে থেকে কাজ করার পরও তারা মনোনয়ন পান না, অথচ কোনো কেন্দ্রীয় নেতা নির্বাচনের মৌসুমে এসে দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

রুমিন ফারহানার ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রয়োগ হচ্ছে। যদিও তিনি জাতীয়ভাবে জনপ্রিয় এবং মিডিয়াতে তার উপস্থিতি শক্তিশালী, কিন্তু স্থানীয়দের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ও সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

রুমিন ফারহানার অবস্থান

রুমিন ফারহানা ২০১৯ সালে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আইনজীবী হিসেবে তার সুপরিচিত ক্যারিয়ার আছে, তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে দলীয় বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তাছাড়া বিএনপির ভেতরে নারীদের মধ্যে অন্যতম পরিচিত মুখ। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হয়তো তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে শক্ত প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাইতে পারে।

তবে স্থানীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বলছেন, তাদের রাজনৈতিক জীবনে দীর্ঘ সময় ধরে সরাইল ও আশুগঞ্জের মানুষের সঙ্গে যে সম্পর্ক, তা কোনো বহিরাগত প্রার্থী প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। এ কারণেই তারা জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নেমেছেন।

ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গি

আসনের সাধারণ ভোটাররা এই দ্বন্দ্বকে ভিন্নভাবে দেখছেন। কারো মতে, বহিরাগত হলেও যদি প্রার্থী শক্তিশালী, শিক্ষিত ও জাতীয়ভাবে পরিচিত হন, তবে তিনি আসনের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন। অন্যদিকে অনেকে মনে করেন, স্থানীয় সমস্যার সমাধান ও জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য স্থানীয় প্রতিনিধি ছাড়া বিকল্প নেই।

এই দুই অবস্থানের টানাপোড়েন নির্বাচনের মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডের সিদ্ধান্ত আসনের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

স্থানীয় বনাম কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। একদিকে স্থানীয় নেতারা নিজেদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের দোহাই দিচ্ছেন। অন্যদিকে কেন্দ্রীয়ভাবে জনপ্রিয় প্রার্থীকে মাঠে নামিয়ে দল যদি জাতীয় পর্যায়ে ইতিবাচক বার্তা দিতে চায়, তাহলে বহিরাগত ইস্যু কার্যকরী না-ও হতে পারে।

দলীয় ঐক্যের সংকট

বিএনপির জন্য আসল চ্যালেঞ্জ হলো— এই আসনে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কাটিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। কারণ নির্বাচনের দিন মাঠে লড়াই করার জন্য স্থানীয়ভাবে ঐক্য অপরিহার্য। যদি প্রার্থীরা বিভক্ত থাকেন এবং মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীর বিরুদ্ধে অঘোষিত প্রতিরোধ চলে, তাহলে দলীয় প্রতীকের পক্ষে ভোট পাওয়া কঠিন হবে।

সম্ভাব্য প্রভাব

  • ১. মনোনয়ন সংকট: যদি রুমিন ফারহানা মনোনয়ন পান, তবে বাকি প্রার্থীদের ক্ষোভ বাড়বে।
  • ২. ভোট বিভাজন: স্থানীয় নেতাদের ভিন্ন অবস্থানের কারণে ভোট বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
  • ৩. জনগণের আস্থা: বহিরাগত বনাম স্থানীয় এই ইস্যু জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।
  • ৪. দলীয় ভাবমূর্তি: দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব থাকলে বিএনপির সামগ্রিক ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার মনোনয়ন প্রশ্ন এখন বিএনপির ভেতরে বড় একটি আলোচনার বিষয়। বহিরাগত ইস্যুতে স্থানীয় প্রার্থীদের ঐক্য তাকে চাপে ফেলেছে বটে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দলীয় উচ্চপর্যায়। স্থানীয় আবেগ ও কেন্দ্রীয় কৌশলের এই দ্বন্দ্ব কেবল রুমিন ফারহানার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেই নয়, বরং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির মাঠপর্যায়ের ঐক্যকেও পরীক্ষা করবে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন