ট্রাম্প গোলাবর্ষণ বন্ধ করতে বলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গাজায় হামলা ইজরায়েলের, মৃত ৬
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত আবারও রক্তাক্ত রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বান সত্ত্বেও গাজা উপত্যকায় অব্যাহত রয়েছে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের তাণ্ডব। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গোলাবর্ষণ বন্ধের আহ্বান জানানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েল নতুন করে বিমান হামলা চালায়। এতে অন্তত ৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে—ইসরায়েল আসলে কাকে শোনে? আন্তর্জাতিক চাপ, নাকি তাদের কৌশলগত পরিকল্পনা অনুযায়ী আগ্রাসী অবস্থান? পাশাপাশি ফিলিস্তিনের মানুষের মানবিক সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
ট্রাম্পের আহ্বান: ‘সংযমী হওয়া উচিত’
ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন রাজনীতির বিতর্কিত তবে প্রভাবশালী এক মুখ। রিপাবলিকান দলের হয়ে আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত তিনি। যুক্তরাষ্ট্র সব সময় ইসরায়েলের অন্যতম বড় মিত্র হলেও ট্রাম্প সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেন, “গাজায় গোলাবর্ষণ ও পাল্টা হামলা বন্ধ করা উচিত। এভাবে নিরীহ মানুষের মৃত্যু হওয়া মানবতার জন্য ভয়ংকর।”
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে প্রবল সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, প্রবাসী মুসলিম ও মানবাধিকারকর্মীরা গাজার প্রতি সহানুভূতিশীল। ফলে নির্বাচনী রাজনীতিতে কিছুটা ‘সহানুভূতির’ বার্তা দেওয়া ট্রাম্পের জন্য কৌশলগত সুবিধা আনতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই আহ্বান কি ইসরায়েলের কানে পৌঁছায়? বাস্তবতা বলছে, না। কারণ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই গাজায় নতুন করে রক্ত ঝরল।
ইসরায়েলের হামলা: ধ্বংসস্তূপে গাজা
ট্রাম্পের আহ্বানের পরপরই গাজায় ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একের পর এক বোমা বর্ষণ করে তারা। এতে বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস হয় এবং ৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
এই হামলার পেছনে ইসরায়েলের যুক্তি—“হামাসের অবস্থান লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা।” কিন্তু বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ, শিশু, নারী ও বয়স্করা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ছবিতে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষজন মরদেহ বের করে আনছে; কোথাও আবার মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে অসহায় পরিবার।
গাজার হাসপাতালগুলোও ইতোমধ্যেই চরম সংকটে। চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, বিদ্যুৎ—সব কিছুর ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠেছে। নতুন করে হামলায় আহতদের সেবা দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: নিন্দা বনাম নীরবতা
ইসরায়েলের এই নতুন হামলার পরপরই কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আবারও ‘তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি’র আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকজন নেতা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো তীব্র প্রতিক্রিয়া আসেনি।
ওয়াশিংটন বরাবরই ইসরায়েলকে “আত্মরক্ষার অধিকার” এর অজুহাত দিয়েছে। যদিও বাস্তবতা হলো, আত্মরক্ষার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় তারা আক্রমণ চালাচ্ছে গাজায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই হামলাকে ‘সম্মিলিত শাস্তি’ (Collective Punishment) বলা যায়, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধের শামিল।
কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতা হলো—ইসরায়েলের পেছনে শক্তিশালী পশ্চিমা মিত্ররা থাকায় কোনো ধরনের জবাবদিহিতা সৃষ্টি হয় না। এ কারণেই ট্রাম্পের আহ্বান কিংবা জাতিসংঘের বিবৃতি—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে।
ফিলিস্তিনি জনগণের মানবিক বিপর্যয়
একদিকে বোমা হামলা, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ—এই দ্বৈত চাপে গাজা আজ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটের এলাকায় পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গাজার অর্ধেকের বেশি মানুষ এখন সরাসরি খাদ্যঘাটতিতে ভুগছে। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি মারাত্মক হারে বাড়ছে।
স্কুল, মসজিদ, হাসপাতাল—কোনো স্থানই নিরাপদ নয়। ফলে বহু পরিবার বাধ্য হচ্ছে আত্মীয়দের বাড়ি কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে থাকতে। কিন্তু সেখানেও নেই পর্যাপ্ত পানি, বিদ্যুৎ বা চিকিৎসা ব্যবস্থা।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে ৬ জনের মৃত্যু শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের স্বপ্ন, আশা আর ভবিষ্যৎ ভেঙে চুরমার হওয়ার প্রতীক।
ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য
প্রশ্ন উঠছে—কেন ট্রাম্পের আহ্বানের পরও ইসরায়েল হামলা চালালো? বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে:
ক্ষমতার বার্তা দেওয়া – ইসরায়েল দেখাতে চায়, তারা আন্তর্জাতিক চাপের তোয়াক্কা করে না। নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলই তাদের কাছে মুখ্য।
হামাসকে দুর্বল করা – দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল চেষ্টা করছে হামাসের সামরিক কাঠামো ভেঙে দিতে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি – ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বর্তমানে ব্যাপক চাপের মধ্যে আছেন। দুর্নীতি মামলা ও জনমতের বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দিতে গাজায় হামলা তার রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে।
এ কারণেই ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গতি না রেখে তারা উল্টো আগ্রাসন বাড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বৃদ্ধি
এই হামলার ফলে শুধু গাজা নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়ছে। লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা, পশ্চিম তীরে সংঘর্ষ, সিরিয়া সীমান্তে গোলাবর্ষণ—সব মিলিয়ে এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই আগ্রাসন থামানো না যায়, তবে তা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ইরান, হিজবুল্লাহ বা অন্য দেশগুলো সরাসরি যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
শান্তির সম্ভাবনা কোথায়?
বর্তমান পরিস্থিতি দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—আসলে শান্তির সম্ভাবনা কোথায়? একদিকে ইসরায়েলি আগ্রাসন, অন্যদিকে হামাসের পাল্টা প্রতিরোধ—এই দ্বন্দ্বে নিরীহ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সমাধান খুঁজতে হলে আন্তর্জাতিক মহলকে শুধু “উদ্বেগ” প্রকাশে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমাধান—স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দিতে হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভূ-রাজনীতি, শক্তির ভারসাম্য ও স্বার্থান্বেষী নীতির কারণে এ সমাধান ক্রমেই দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প গোলাবর্ষণ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, নাকি রাজনৈতিক কৌশল থেকে—তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু নিশ্চিত বিষয় হলো, সেই আহ্বানের কোনো প্রভাব পড়েনি ইসরায়েলের ওপর। বরং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন হামলা চালিয়ে তারা জানিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক চাপ বা বিবৃতি তাদের পথ আটকাতে পারবে না।
৬ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু সংখ্যার দিক থেকে হয়তো কম মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের কান্না, বেদনা আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। গাজা আজ বিশ্বমানবতার জন্য এক পরীক্ষা—আমরা কি শুধু দর্শক হয়ে থাকব, নাকি সত্যিই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাব?