মিরপুরে আগুন: গুদামে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে, মুহূর্তেই অচেতন হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি

মিরপুরে আগুন: গুদামে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে
 মিরপুরে আগুন: গুদামে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে

 মিরপুরে আগুন: গুদামে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে, মুহূর্তেই অচেতন হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি

রাজধানীর মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া রাসায়নিক গুদামে পাওয়া গেছে প্রাণঘাতী বিষাক্ত গ্যাস হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S)। শুক্রবার বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা গুদামের ভেতর প্রবেশ করে গ্যাস ডিটেকটরের মাধ্যমে মাপ নিলে দেখা যায়, গুদামের ভেতরে গ্যাসের মাত্রা দাঁড়িয়েছে ১৪৯ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন)—যা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি এবং মুহূর্তের মধ্যেই প্রাণহানির ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা ও ভয়াবহতা

বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের দলনেতা সহকারী পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের জানান, “হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ১০০ পিপিএমের বেশি হলেই তাৎক্ষণিকভাবে জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো ব্যক্তি যদি নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া ওই পরিবেশে প্রবেশ করে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অচেতন হয়ে মৃত্যু হতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) গ্যাসের মাত্রা ছিল প্রায় ২০ পিপিএম, যা তখনও বিপজ্জনক ছিল। কিন্তু আজ গুদামের ভেতর গিয়ে দেখা গেছে মাত্রা বেড়ে ১৪৯ পিপিএমে পৌঁছেছে। এর মানে, আগুনের পর গুদামের রাসায়নিক পদার্থগুলো আরও প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছে এবং তাপ ও ধোঁয়ার প্রভাবে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।

আশপাশের এলাকায় ঝুঁকি

মাহমুদুজ্জামান জানান, গুদামের বাইরে বাতাসে গ্যাসের মাত্রাও ৭০ থেকে ৮০ পিপিএম। অর্থাৎ বাইরে থেকেও এটি শ্বাসপ্রশ্বাসে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তাঁর মতে, আশপাশের ১৫০ থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত এলাকা খালি করে ফেলা উচিত, যাতে বাসিন্দারা নিরাপদে থাকতে পারেন। আর বাতাসের প্রবাহ যেদিকে যাচ্ছে, সেই দিকের অন্তত দেড় কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত মানুষ সরিয়ে নেওয়া জরুরি, কারণ বাতাসের সঙ্গে এই গ্যাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, “হাইড্রোজেন সালফাইডের গন্ধ পচা ডিমের মতো হলেও, উচ্চমাত্রায় এ গ্যাস ঘ্রাণের ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। অর্থাৎ একবার আপনি গ্যাসের ঘ্রাণ টের না পেলেও সেটা আপনার শরীরে ঢুকে যেতে পারে—যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।”

গুদামের ভেতরে রাসায়নিকের স্তূপ

ঘটনাস্থলে উপস্থিত বোম্ব ডিসপোজাল টিমের সদস্যরা জানান, গুদামের ভেতরে এখনো অনেক রাসায়নিক পদার্থের বস্তা পড়ে আছে, যেগুলো আগুনের পর গলে গিয়ে বা পুড়ে গিয়ে বিষাক্ত উপাদানে রূপ নিয়েছে। এসব রাসায়নিক একে অপরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে গ্যাস তৈরি করছে, যা থেকে আগুন আবারও জ্বলে উঠতে পারে।

মাহমুদুজ্জামান বলেন, “আমরা ভেতরে কার্বন মনো-অক্সাইড গ্যাসেরও উপস্থিতি পেয়েছি—মাত্রা প্রায় ৩ পিপিএম। গতকাল এটা ছিল শূন্য। এর মানে, ভেতরের তাপমাত্রা ও রাসায়নিকের প্রতিক্রিয়া এখনো চলছে।”

জনগণের প্রতি সতর্কবার্তা

সহকারী পুলিশ কমিশনার আহ্বান জানান, কেউ যেন কৌতূহলবশত বা নিহতদের খোঁজে গুদাম এলাকায় না যান। “আমরা দেখছি, অনেকে স্বজনদের খোঁজে বা শুধু দেখতে ভিড় করছেন। কিন্তু বুঝতে হবে, এটি কোনো সাধারণ আগুন নয়। রাসায়নিকের আগুনের ধোঁয়া ও গ্যাস উভয়ই বিষাক্ত। চোখ, নাক, ফুসফুসে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় এলাকা ঘিরে ফেলা হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে সরে যেতে বলা হয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষ সতর্কতা উপেক্ষা করে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছেন, যা প্রাণঘাতী ভুল হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

রাসায়নিক বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইড্রোজেন সালফাইড একটি অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস, যা বর্ণহীন হলেও পচা ডিমের মতো গন্ধযুক্ত। এটি শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে অক্সিজেনের ঘাটতি ঘটায়, ফলে মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কাজ করা বন্ধ করে দেয়। মাত্র ১০০ পিপিএম গ্যাসেই একজন মানুষ অচেতন হয়ে পড়তে পারে, আর ২০০ পিপিএম বা তার বেশি হলে কয়েক মিনিটের মধ্যে মৃত্যু হতে পারে।

একজন পরিবেশবিজ্ঞানী বলেন, “এই ধরনের রাসায়নিক আগুনের পর এলাকাটি শুধু গ্যাস নয়, মাটিও দূষিত হতে পারে। পানি বা বৃষ্টির সংস্পর্শে এ রাসায়নিক আশপাশের পরিবেশে মিশে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।”

উদ্ধারকাজে চ্যালেঞ্জ

আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পরও উদ্ধারকাজ পুরোপুরি শুরু করা যায়নি গ্যাসের কারণে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা বিশেষ প্রতিরক্ষামূলক পোশাক (PPE) ও অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া ভেতরে প্রবেশ করতে পারছেন না। ফলে নিখোঁজদের খোঁজ এবং রাসায়নিক অপসারণের কাজ ধীর গতিতে চলছে।

মিরপুরের এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি গুদাম পুড়ে যাওয়ার ঘটনা নয়, বরং এটি শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক মজুদের ভয়াবহ ঝুঁকি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। অপ্রস্তুত অবস্থায়, যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এ ধরনের গুদাম পরিচালনা কতটা বিপজ্জনক—তা এই দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে।

সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের এখন প্রধান কাজ হওয়া উচিত এলাকা নিরাপদ করা, গ্যাস নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ভবিষ্যতে এমন গুদামগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ, মাত্র কয়েক মিনিটের গ্যাস নিঃসরণই পারে একটি পুরো এলাকার জীবনকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করতে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন