বাড়তি ভ্যাটে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা
নতুন করে ভ্যাট বাড়ানোর সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছে ব্যবসায়ীরা। তৈরি পোশাক, এসি রেস্তোরাঁ, নন-এসি হোটেল, মিষ্টি এবং ৪৩ ধরনের পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট পরিবর্তিত হতে পারে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আলোচনা ছাড়া হঠাৎ করে ভ্যাট বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত অবিবেচনাপ্রসূত। এতে জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং ব্যবসা আবার সংকটে পড়বে।
ভ্যাট
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে জিনিসপত্রের দামে বড় কোন পরিবর্তন হবে না। তিনি জানিয়ে দিলেন, অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের শুল্ক কমানো হয়েছে, যা দামকে প্রভাবিত করবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ভ্যাট ও অন্যান্য করের বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, এসি রেস্তোরাঁ, মিষ্টি এবং নন-এসি হোটেলের ক্ষেত্রে ভ্যাট ১৫ শতাংশে পৌঁছতে পারে।
পাশাপাশি ব্যবসায়ী নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ব্যবসা-বাণিজ্যকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তারা মনে করেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই।ভ্যাট সরকারের রাজস্ব আদায়ের একটি প্রধান মাধ্যম। বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫ লাখ ২৫ হাজার, যার মধ্যে গড়ে সাড়ে তিন লাখ প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে ভ্যাট প্রদান করছে। এখনও লাখ লাখ প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা ভ্যাটের আওতায় আসেনি, এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাদের নিবন্ধন ও ভ্যাট আদায়ের কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারছে না। ফলে প্রয়োজনীয় উন্নতির অভাব রয়েছে, যেমন ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস (ইএফডি) স্থাপন করার ক্ষেত্রে।
এদিকে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা, যেখানে নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকা।
সম্প্রতি, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ঋণের শর্ত হিসেবে ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশকে দেওয়া ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের চলমান ঋণ কর্মসূচির চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড়ার আগে গত ডিসেম্বরে আইএমএফের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সফর করেন। বাংলাদেশ আরও ৭৫ কোটি ডলার বাড়ানোর অনুরোধ জানায়, যা আইএমএফ মেনে নেয়। তবে এর জন্য রাজস্ব আহরণের নীতি গ্রহণ এবং অন্য কিছু কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন যে, এই অবস্থার কারণে ভ্যাট বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলছেন, ‘রাজস্ব আয় বাড়ানো ছাড়া সরকারের জন্য বিকল্প কোন পথ নেই। প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো কঠিন, তাই সরকার ভ্যাট হারের পরিবর্তনের সহজ পথে হেঁটেছে। পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে মানুষের কষ্ট কিছুটা কম হতে পারত।’
ব্যবসায়ীদের ক্ষোভের কারণ হলো, এখন থেকে রেস্তোরাঁয় খাবারের বিলের ওপরে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রদান করতে হবে, যেখানে আগে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) রেস্তোরাঁয় ৫ শতাংশ ভ্যাট ধার্য ছিল।
আন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ বাড়ানোর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে মোট ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৭৪টি হোটেল ও রেস্তোরাঁ ছিল, যা গত তিন বছরে বেড়ে গেছে, যদিও সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
ভ্যাট বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, "রেস্তোরাঁ মালিকেরা উদ্বিগ্ন। যদি ভ্যাট একবারে তিন গুণ বাড়ানো হয়, তাহলে ব্যবসায় মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি আয়করও বাড়বে। নিয়ম মেনে যারা ব্যবসা করেন, তাদের ওপর সব সময়ই চাপ সৃষ্টি হয়। আসলে আইএমএফের পরামর্শে ব্যবসায়ীদের পথে বসানোর চেষ্টা চলছে। ভ্যাট বৃদ্ধি প্রত্যাহার করা না হলে, সমিতির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।"
Tags
বাংলাদেশ